শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

চার মাস ধরেই ছিল না স্লিপারের নাট-ক্লিপ, সেতুটিও ছিল লক্করঝক্কর
বরমচাল ট্রেন দুর্ঘটনা

বরমচাল ট্রেন দুর্ঘটনা



ওমর ফারুক নাঈম, কুলাউড়া থেকে ফিরে ::

গত চার মাস ধরে এই সেতু দিয়ে যখন ট্রেন যেত তখনই লক্করঝক্কর করত। স্লিপারের কোথাও নাট নেই আমার কোথাও ক্লিপ নেই। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি জানিয়েছিলেন স্থানীয়রা। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়। অনেকই সময় রেল কর্মীরা মেইন্টেনেন্স করতেন না।

সরেজমিনে জানা যায়, ঢাকাগামী উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি সিলেট থেকে ছেড়ে আসার পরই অতিরিক্ত গতি বাড়ানো হয়। কুলাউড়ার বরমচাল স্টেশনে ডোকার পরপর ড্রাইভার আরোও গতি বাড়িয়ে দেয়। স্থানীয়রা বলছেন পূর্ব থেকেই ঘটনাস্থলে কয়েকটি স্লিপারে ক্লিপ ছিলনা। যার কারনে ট্রেনটি ওবার স্পিডে থাকায় এ দূর্ঘটনা ঘটে।

স্লিপারে ক্লিপ বসানোর জন্য স্থানীয়রা একাধিকবার কর্তৃপক্ষকে বললেও তারা কর্ণপাত করেনি। এনিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা সৌদি আরব প্রবাসী লুৎফুর রহমান রাজু চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারী একটি পোস্ট দেন। এতে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং স্থানীয়দের সচেতন হওয়ার আহব্বান করেন। এর পরেও কোনো গুরুত্ব দেয়নি রেল কর্তৃপক্ষ।

এলাকাবাসী হাফিজ মাজিদ ডিএমবিকে বলেন, “দীর্ঘ দিন ধরে বিষয়টি সামাজিক মাধ্যম সহ সবাইকে জানানোর চেষ্টা করেছি। সবাই বিষয়টি ধফায় ধফায় রেল স্ট্রেশনে জানিয়েছেন। কিন্তু তারা কোনও ব্যবস্থাই নেয়নি। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যরাও একিই অভিযোগ করেছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন- যখন ট্রেন আসত তখন এই জায়গাটা কম গতি দিয়ে অতিক্রম করত। কিন্তু দুর্ঘটনার রাতে খুব স্পিডে ট্রেনটি আসছিল। তারপরই ধসে পরে যায়। খুবই বিকট আওয়াজ হয়।

সিলেট থেকে কুলাউড়ার লংলাগামী যাত্রী ফয়ছল আলী (২৫) জানান বিকট শব্দে প্রথমে আতংকিত হয়ে অনেক যাত্রী ভয় পায়। তিনি বলেন, প্রথমে তারা বুঝতে পারেননি। অনেক সময় আটকে থাকার পর রেল থেকে নেমে দেখতে পান পেছনের দিকে ৫টি বগি লাইনচ্যুত হয়ে গেছে। তখন অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসও আসে। তারা তখন বুঝতে পারেন বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। রেল লাইনের নিকটস্থ বাসিন্দা প্রত্যক্ষদর্শী ফারুক মিয়া জানান শব্দ পেয়ে আমরা এলাকাবাসি এসে আহতদের উদ্ধার করি।

সিলেট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা আন্ত:নগর উপবন এক্সপ্রেস ওভার স্পীডও রেললাইনের ত্রুটি’র কারণে ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। এতে ট্রেনের ৫টি বগি খাদে পড়ে। ঘটনাস্থলেই ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ২৫০ জন। রোববার রাত পৌনে ১২টার দিকে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল স্টেশন থেকে ২০০ মিটার দূরে কালা মিয়া বাজার সংলগ্ন একটি ব্রিজে এ দুর্ঘটনা ঘটে। আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা গুরুতর। রাতে নিহতদের লাশ ও আহতদের উদ্ধারের পর সোমবার সকাল থেকে চলে রেল লাইন মেরামতের কাজ। সন্ধার সাথে সাথে ফের ট্রেইন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

সিলেট-ঢাকা, মৌলভীবাজার-ঢাকা ও হবিগঞ্জ-ঢাকা মহাসড়কের ভৈরব এলাকায় শাবাহাজপুর তিতাস সেতুর রেলিং ভেঙ্গে ৭ দিন ধরে যান চলাচল বন্ধ থাকায় ট্রেনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন ঢাকাগামী যাত্রীরা। ফলে ধারণক্ষমতার চেয়ে তিনগুণ যাত্রী নিয়ে ট্রেনটি সিলেট থেকে ছেড়ে যায়।

এঘটনায় পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রেল পথ মন্ত্রনালয়ের সচিব মোফাজ্জল হোসেন জানান, চিফ ম্যাকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার (পূর্বাঞ্চল) মিজানুর রহমানকে প্রধান করে ৪ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসময় দূর্ঘটনার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্তক্রমে জানা যাবে।

অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার রাশেদুল ইসলাম জানান, ‘দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত চার জন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন নারী, বাকি একজন পুরুষ। লাশগুলোর পরিচয় পাওয়া গেছে এবং তাদের স্বজনরা হাসপাতালের মর্গ থেকে সনাক্ত করে লাশ নিয়ে গেছে।’

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত