শনিবার, ২৪ অগাস্ট ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৯ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

এ কেমন প্রধান শিক্ষক?



ডিএমবি ডেস্ক:: 

প্রধান শিক্ষকের যৌন লালসার ভয়ে তটস্থ থাকতে হয় শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ প্রতিবেশীরাও। এ যেন এক নব্য পরিমল বা সিরাজের উত্থানের গল্প। স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, ম্যানেজিং কমিটি কিংবা গ্রামবাসী- এখন সবার মুখে মুখে তার লাম্পট্যের নানা কাহিনী। পঞ্চাশোর্ধ্ব ওই শিক্ষক এখনো বসেননি বিয়ের পিঁড়িতে। নারীলোভী, যৌন নিপীড়ক ও লাম্পট্য। তার এমন কুকর্মে ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী তাকে এসব উপাধিই দিয়েছেন।

জেলা জুড়ে আলোচিত ওই প্রধান শিক্ষক হলেন কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের তেলিবিল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নোমান আহমদ। নীরবে দীর্ঘদিন থেকে তার এ কুকর্ম চলছে বীরদর্পে। দীর্ঘদিন থেকে এলাকায় গড়ে তুলেছেন নিজস্ব বলয়।

গ্রাম্য মোড়ল আর জনপ্রতিনিধি থেকে গাড়ি চালক- সবাই তার এই অপকর্মের নিত্য সঙ্গী। নিজ স্কুলের শিক্ষিকা ও ছাত্রী। পাড়া প্রতিবেশী বিধবা কিংবা প্রবাসীর স্ত্রী। নিজ স্কুলের একাধিক শিক্ষিকা। বিবাহ উপযুক্ত গরিব ঘরের মেয়ে কিংবা আত্মীয়স্বজন কেউই রেহাই পায় না তার কুদৃষ্টি থেকে। তার যৌন লালসার শিকার অনেকেই লোকলজ্জার ভয়ে মুখ খোলেন না কিংবা প্রতিবাদও করেন না। বরং নীরবে অনেক শিক্ষিকা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। এমন এক নব্য লম্পট ও যৌন নিপীড়নকারী হিসেবে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষককে নিয়ে জেলা জুড়ে চলছে নানা সমালোচনা। দীর্ঘদিন থেকে অনেকেই তার এমন যৌন লালসার শিকার হলেও কেউ তা প্রকাশ করেন নি। কিন্তু সম্প্রতি বাধা হয়ে দাঁড়ান তার স্কুলে সদ্য নিয়োগ পাওয়া এক সহকারী শিক্ষিকা। নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে ওই শিক্ষিকাকে নানাভাবে কুপ্রস্তাব দিতে থাকেন অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক নোমান আহমদ। তার কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়াতে তার নিজস্ব বলয়ের লোকজন দিয়ে তাকে নানাভাবে হুমকি ধমকিতে নাজেহাল করাতে থাকেন। কিন্তু লোকলজ্জার ভয়ে ওই শিক্ষিকা নীরবে তা সহ্য করতে থাকেন। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে তিনি প্রতিবাদী হন।

ওই শিক্ষিকার প্রতিবাদের সূত্র ধরে এখন একে একে বেরিয়ে আসছে তার নানা যৌন কেলেংকারীর অপকর্ম। ওই সহকারী শিক্ষিকা প্রধান শিক্ষক নোমানের এমন যৌন হয়রানির প্রতিকার ও নিরাপত্তা চেয়ে প্রথমে কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করেন। এরপর ওই অভিযোগের সত্যতার ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে কুলাউড়া থানায় মামলা করেন তিনি। জানা যায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে এনটিআরসির মাধ্যমে উপজেলার তেলিবিল উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগ পান ওই শিক্ষিকা। যোগদানের পর শিক্ষিকার এমপিও পদ করার জন্য স্কুলের প্রধান শিক্ষক নোমান আহমদ তার সমস্ত কাগজাদি ও ফাইল রেডি করে যত টাকা খরচ লাগবে তিনি সেই টাকা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। বিনিময়ে ওই শিক্ষিকাকে তার দেয়া নানা ধরনের যৌন হয়রানিমূলক আচরণ ও বিয়ে করতে রাজি হওয়ার প্রস্তাব দেন। এই সুযোগে বিভিন্ন সময়ে প্রধান শিক্ষক তার রুমে ডেকে নিয়ে শিক্ষিকাকে কুরুচিপূর্ণ, অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে যৌন হয়রানি করতেন। প্রধান শিক্ষক ওই শিক্ষিকাকে তার বাড়িতে ও শ্রীমঙ্গলের একটি রেস্ট হাউসে ঘুরে আসার প্রস্তাব দেন। তার ওই প্রস্তাবে রাজি হননি শিক্ষিকা। এরপরও দমেননি ওই প্রধান শিক্ষক। প্রধান শিক্ষক নোমান আহমদ ক্ষমতার দাপট খাটিয়ে বিভিন্ন সময় তার পরিবারের সদস্য ও স্কুলের দপ্তরির মাধ্যমে ওই শিক্ষিকাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু শিক্ষিকা অসম বিয়ের এই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেন।

এরপর ওই শিক্ষিকাসহ আরো দুজন শিক্ষিকাকে এমপিও করানোর কথা বলে ৬০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। এ বিষয়টি চাউর হলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে শুরু হয় কানাঘোষা। স্থানীয় ও শিক্ষক নেতাদের উদ্যোগে ওই প্রধান শিক্ষক নোমান আহমদের এমন অপকর্ম থামানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তার দাপটের কাছে তাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর ন্যায়বিচারের জন্য ওই শিক্ষিকা কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে লিখিত অভিযোগ দেন। এ অভিযোগে ২৫শে জুলাই ওই সহকারী শিক্ষিকা প্রধান শিক্ষক নোমান আহমদকে আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় থানায় মামলা করেন। তেলিবিল এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা ক্ষোভের সঙ্গে জানান এই নেশাগ্রস্ত যৌন হয়রানিকারী লম্পট ও স্কুলের টাকা আত্মসাৎকারী প্রধান শিক্ষককে দ্রুত অপসারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক। অন্যথায় আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবো।

ওই শিক্ষিকা ও তার বাবা মুঠোফোনে জানান, মামলার পর থেকে নানাভাবে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন। আমরা অবিলম্বে এই চরিত্রহীন লম্পট শিক্ষকের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি। যাতে তার কারণে পুরো শিক্ষক সমাজের মানসম্মান নষ্ট না হয়। তবে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক নোমান আহমদের বক্তব্য নিতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সাঈদ মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন এ বিষয়ে আমি এই প্রথম জেনেছি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহ জালাল জানান, ঘটনাটি শোনে আমি এবিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে অবশ্যই দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে। মামলা নেয়া হয়েছে আসামিদেরও গ্রেপ্তার করা হবে।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত