শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ২১ চৈত্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

মাইন বিস্ফোরনে গুরুতর আহত হন মুক্তিযোদ্ধের সংগঠক আব্দুন নূর মাষ্টার
স্মৃতিপটে ১৯৭১!

স্মৃতিপটে ১৯৭১!



বিশ্বজিৎ রায়:

মুক্তিযোদ্ধের সংগটক আব্দুন নূর মাষ্টার দিনে চাকুরী ও রাতে মুক্তি বাহিনীকে সংগঠিত করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা জমায়েত ও সৌজন্য সাক্ষাত অনুষ্টানে মৌলভীবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক মাইন বিস্ফোরনে গুরুতর আহত হন। মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার এক আলোকিত ব্যক্তিত্ব আব্দুন নূর মাস্টার।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে স্বৈরাচারের অবসান ও গনতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন সহ জনগনের প্রতিটি ন্যায় সংগত লড়াইয়ে কমলগঞ্জের যেসব সোনার ছেলেরা সেদিন সমাজ বদলের স্বপ্নকে বুকে লালন করে আন্দোলন শুরু করেছিলেন এবং পরবর্তীতে আমাদের গৌরবময় মুক্তিযোদ্ধ পর্যন্ত যারা এ আন্দোলনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, সমৃদ্ধ করেছেন, তাদের মধ্যে আব্দুর নূর মাষ্টার অন্যতম। উনসত্তুরের গন অভ্যূত্থান থেকে ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত সবক’টি আন্দোলনে তিনির নিজ এলাকার মূল উদ্যোক্তাদের মধ্যে আব্দুর নূর ছিলেন অন্যতম। তার উদ্যোগ উদ্যাম ছিল সর্বজন বিদিত। আব্দুর নূর মাষ্টার মাষ্টার যখন কুলাউড়া কে, সি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র তৎকালীন সময়ে এই এলাকা ছিল বাম রাজনীতির ও আন্দোলনের ঘাঁটি। আব্দুর নূর মাষ্টার ছিলেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)র ছাত্র সংগঠনের নেতা। তরুন বয়সেই সমাজ রাজনীতির হাতেখড়ি নেওয়ায় বেগম মতিয়া চৌধুরী, কাজী জাফর আহমদ, হায়দার আকবর খান রনো প্রমুখ দেশবরেণ্য প্রগতিশীল রাজনীতিবিদদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ হয়েছিল তার।

ঐতিহাসিক হাওর করাইয়ার কৃষক আন্দোলনে মৃত আবু কায়সার খান, কুলাউড়া রাজা সাহেব, মফিজ আলী, সৈয়দ মতিউর রহমান, তারা মিয়া ও বীর কটু মিয়া প্রমুখ ব্যক্তিবর্গের সাথে তিনি ও সেই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। স্বৈরাচার আইয়ুব সরকার বিরোধী আন্দোলন ও ১৯৬৯ এর দেশব্যাপী গণ আন্দোলনের ঢেউ যখন কমলগঞ্জ উপজেলায় এসে লেগেছিল। তখন মৃত ইলিয়াছুর রহমান চৌধুরী এমপি সাহেবের নেতৃত্বে ঐ সময়ে কমলগঞ্জে বিভিন্ন আন্দোলনে মৃত আব্দুল গফুর (নেতা গফুর) বাবু সত্যেন্দ্র মোহন দেব, মৃত গোলজার আহমদ খান, মৃত জহির উদ্দিন চৌধুরী, আব্দুর নূর মাষ্টার মৃত ওমর আলী, মৃত সফিকুর রহমান চৌধুরী,মৃত আব্দুল মছব্বির মাস্টার প্রমুখ সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের শুরু থেকেই যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম সুনির্দিষ্ট রুপ লাভ করতে থাকে তখন ছাত্র সমাজকে সেই ধারায় সংগঠিত ও সমাবেশ ঘটানোর জন্য এ উপজেলায় যে ক’জন প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন আব্দুর নূর মাষ্টার তাদের মধ্যে অন্যতম একজন।

দিনে চাকুরী ও রাতে মুক্তি বাহিনীকে সংগঠিত করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন তিনি। গোপনে সৈয়দ শামছুজ্জাম, ললিত মোহন দাস, প্রমোদ রঞ্জন দাস, উস্তার মিয়া মাস্টার, তৈয়ব উল্যা, ইয়াছিন মিয়া, এডভোকেট আব্দুস ছোবান, ইমান আলী প্রমুখ ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের প্রস্তুতি নেন তিনি।

ভারতে ট্রেনিং নিয়ে সৈয়দ মহসীন আলীর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী এলাকায় প্রবেশ করলে তিনি প্রথমে তাদের গোপিনগরের আরজু মিয়া সাবেরর বাড়ীতে থাকার ব্যাবস্থা করে দেন। পাক বাহিনী খবর পেয়ে আরজু মিয়া সাবেরর বাড়ী জ্বালিয়ে দিলে তিনি তাদের পালপুর গ্রামের আব্দুল আহাদ চৌধুরী সফিক মিয়া সাহেবের বাড়ীতে নিয়ে যান। সেখানে থেকে তার সহযোগীতায় মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন এলাকায় একাধিক অপারেশন চালিয়েছেন। মুক্তিযুুদ্ধের শেষ পর্যায়ে মুন্সীবাজার পাঞ্জাবী ক্যাম্পে হানা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সৈয়দ মতিউর রহমান ভারত থেকে প্রায় ২০০ মুক্তি বাহিনী ও শিখ সৈন্য নিয়ে পালপুরে এসে তাদের সাথে যোগ দেন। অপারেশনের পরিকল্পনা নিয়ে নির্দিষ্ট দিনে মুন্সীবাজার পাঞ্জাবী ক্যাম্পে চর্তুরদিক থেকে সাড়াঁসী আক্রমন চালানো হয়। টানা ২ দিন যুদ্ধের পর পাকবাহিনীর কিছু সৈন্য শমশেরনগর দিকে পালিয়ে যায়। বাকীরা আত্মসমর্পণ করে, শত্রু মুক্ত হয় পাক এই এলাকা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মৌলভীবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জেলার সকল মুক্তিযোদ্ধারা জমায়েত ও সৌজন্য অনুষ্টানে এক মাইন বিস্ফোরনে আব্দুন নূর মাষ্টার গুরুতর আহত হন। সেই ভয়াবহ দূর্ঘটনার ক্ষত চিহ্ন এখনও তিনি বয়ে বেড়াচ্ছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে পাক-হানাদারদের দোসর কর্তৃক এলাকার লোকজনের বাড়ীঘর থেকে লুন্টিত মালামাল উদ্ধারেও তার প্রসংশনীয় ভূমিকা ছিল।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী আব্দুর নূর মাষ্টার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ১৯৭২ সাল থেকেই আওয়ামী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি সমাজ কর্মের প্রতিই অধিকতর মনোযোগী হয়ে পড়েন। জনসেবার অংশ হিসাবে সমাজের বাদ বিবাদ নিষ্পত্তিতে শালিস বিচারক হয়ে উঠেন। একজন দক্ষ প্রথম সারির শালিস বিচারক হিসাবে জেলার বিভিন্ন থানায় জটিল বিষয় নিরসনে উনার প্রয়োজনীয়তা এখনও সর্বজন স্বীকৃত। শালিস বিচারে ৮০ ভাগ বিরোধ-ই তার জীবনে নিষ্পত্তি হয়েছে। ১৯৫০ সালে জানুয়ারী মাসে কমলগঞ্জ উপজেলার পতন ঊষার ইউনিয়নের গোপীনগর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে আব্দুর নূর মাষ্টার সাহেবের জন্ম। পিতা মরহুম মোহাম্মদ আমিল মাস্টার মাতা মরহুম নেকজান বিবি ,৭ ভাই বোনের মধ্যে সর্ব কনিষ্ট তিনি। মাত্র ৭ বছর বয়সে তাকে হতে হয় পিতৃহারা । কনিষ্ট চাচা ক্বারী ইউসুফ আলীর কাছে ধর্মী শিক্ষা গ্রহণের পর মরিচা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে কুলাউড়া কে, সি উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন কালে তিনি খেলাধূলা ছাড়াও সাংস্কৃতিক- সামাজিক কর্মকান্ডে যুক্ত হয়ে পড়েন। এস, এসসি উর্ত্তীণ হওয়ার পর পিতা ও পিতামহের আদর্শে শিক্ষকতাকেই তিনি পেশা হিসাবে বেঁচে নেন। ১৯৬৮ ইং সালে মৌলভীবাজার জেলা পিটিআই থেকে একজন আউট সাইডার হিসেবে ট্রেনিং গ্রহণ শেষে স্থানীয় শ্রীরামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় শিকতার পেশায় নিযুক্ত হন। একজন আদর্শ শিক্ষকের মধ্যে যতগুন থাকা প্রয়োজন তার কোনটিই কম ছিলনা তার মধ্যে। তাঁর অনেক ছাত্র আজ দেশে বিদেশে সরকারী- বেসরকারী বিভিন্ন অঙ্গনে সুনামের সহিত কাজ করছেন।

পেশাগত জীবনে একজন আদর্শ শিক্ষক হিসাবে যেমন তার সুখ্যাতি রয়েছে তেমনি শিক্ষকতা জীবনে উপজেলা ভিত্তিক শিক্ষক সমাজে নেতৃত্ব দানে তার আপোষহীন নীতির কারনে একাধারে দীর্ঘদিন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি কমলগঞ্জ থানা শাখার সাধারন সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্ধী হীনভাবে দায়িত্ব পালন করারও সুযোগ ঘটেছিল তার জীবনে। শুধু একজন আদর্শ শিক্ষক হিসাবেই নয়, একজন দক্ষ দলিল লেখক হিসাবেও তার সুখ্যাতি রয়েছে। শিক্ষকতার পাশাপাশি এই পেশায় সম্পৃক্ত থেকে তিনি প্রায় ২৫ হাজার দলিল সম্পাদন করেছন- যার মধ্যে কোনটিতেই কোন ত্রুটি ধরা পড়েনি। শুধু দলিল সম্পাদন নয়, একজন সার্ভেয়ার হিসাবেও এলাকায় ভূমির ভাগ বাটোয়ারা, ভূমি জরিপ ইত্যাদি বিনা পয়সায় করে দিতেন। মানুষকে আপন করার এক যাদুকরী ক্ষমতার অধিকারী আব্দুর নূর মাষ্টার যেখানেই যে অবস্থায় যার কাছেই গেছেন তাকেই আপন করেছেন। পরমাত্মীয় হয়ে উঠেছেন ঐসব লোকেদের। হিংসা লোভ আর ক্ষমতার মোহ কোন দিনও তাকে গ্রাস করতে পারেনি । একজন নিঃস্বার্থ ও নীতিবান সমাজকর্মী হিসাবে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি ধর্ম বর্ন আর রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন অকৃর্পণ হাতে।

শিক্ষকতা জীবন থেকে অনেক আগেই অবসর নিলেও নিজ এলাকার সামাজিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি এলাকার শিক্ষা, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের উন্নয়নে এখনও তিনি সক্রিয় রয়েছেন। পতনঊষার উচ্চ বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য সহ বিভিন্ন শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। ব্যাক্তিগত জীবনে আব্দুন নূর মাস্টার ৪ পুত্র ও ২ কন্যা সন্তানের জনক। বড় ছেলে নজরুল ইসলাম দেশ থেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বর্তমানে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত রয়েল মার্সডেন ক্যান্সার রিসার্স হসপিটালে ইন্সিডেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন।

ছেলে রিপন ইসলাম ময়নুল, কমিনিটি নেতা , ট্রাস্টি আব্দুন নুর নুরজাহান চৌধুরী কল্যাণ ট্রাস্ট ,কাউন্সিলর ,সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান , নিবাচিত প্যানেল চেয়ারম্যান পতন উষার ইউপি, সাংগঠনিক সম্পাদক- পতন উষার ইউপি আওয়ামী লীগ। গভির্নিং কমিটি চেয়ারম্যান বৃন্দাবনপুর সেন্টার স্কুল। ছেলে নাজমুল ইসলাম ইমন যুক্তরাজ্যে র সান্দারল্যান্ড ইউনিভাসিটি থেকে BA (Hons) International Tourism and Hospitality Management উপর উচ্চতর ডিগ্রী করেছেন। নাজমুল ইসলাম ইমন যুক্তরাজ্য ছাত্রলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক , কমিনিটি কাজের সাথে সম্পৃক্ত এবং কাজ করছেন বিশ্ববিখ্যাত দি রয়েল মার্সডেন ক্যান্সার স্পেশালিস্ট হাসপাতালে নন ক্লিনিক্যাল স্টাফ হিসাবে। ছোট ছেলে ডাঃ কামরুল ইসলাম শিপু সফলতার সাথে এমবিবিএস পাস করে নর্থ ইষ্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডিপার্টমেন্ট অব মাইক্রোবায়োলজির লেকচারার হিসেবে কর্মরত আছেন। At the same time ডাঃ কামরুল ইসলাম শিপু IT advisor for North East Medical college. মেডিকেলে ছাত্রাবস্থায় শিপু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ২আই প্রকল্পের “বেস্ট ইনোভেটিভ আইডিয়া” প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরষ্কার পেয়েছিলেন।

ইতোমধ্যে শিপু যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া থেকে “ফান্ডামেন্টালস অব ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি’’ এবং রাইস ইউনিভার্সিটি থেকে “ফান্ডামেন্টালস অব ইম্যুনোলজি’’ তে কোর্সের ফান্ডিংয়ে ডিস্টান্স লার্নিং এর মাধ্যমে কোর্স সম্পন্ন করেছেন। অদ্য ,যুক্তরাজ্যের দ্য ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরা থেকে “মাস্টার্স ইন্ ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজি এন্ড ইনফেকশাস ডিজিস” ডিগ্রিতে ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ পেয়েছেন মৌলভীবাজারের কৃতি সন্তান ডা: কামরুল ইসলাম শিপু। মেয়ে শান্ত ইসলাম সিলেটে the স্কলার হোম ইন্টারন্যাশনাল পড়া শুনা করেছেন ,বর্তমানে স্বামীর সাথে যুক্তরাজ্যে বাস করছেন! দেশ-সমাজের জন্য তার আরও অনেক কিছু করার পরিকল্পনা রয়েছে । তিনি দীর্ঘায়ু লাভ করুন এবং তার সকল স্বপ্ন বাস্তবে রুপলাভ করুক এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: বিশ্বজিৎ রায়, সাংবাদিক, কলাম লেখক ও সভাপতি. কমলগঞ্জ প্রেসক্লাব।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত