শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ২৮ ভাদ্র ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

আমাদের সিলেটের গর্ব, কিংবদন্তি সাধক, বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম সাহেবের ১১তম মৃত্যুবাষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা।



আহমেদ জহুর;জয়টিভির সাংবাদিক আমিরুল ইসলাম একদিন বাউলসাধক শাহ আবদুল করিমের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ‘আপনার মুর্শিদ কে?’ জবাবে শাহ করিম বলেছিলেন, ‘আমি সর্বপ্রথম মুর্শিদ-জ্ঞান করি আমার বউ সরলাকে। কারণ বিভিন্ন সময় ওকে কোনকিছু না বলে আমি চলে গেছি অজানা কোনখানে। তিন-চার মাস পরে ফিরে এসেছি। কিন্তু সরলা আমাকে আগের মতই আদর-যত্ন করেছে। একবারও সে জানতে চায়নি এতোদিন আমি কোথায় ছিলাম, কার কাছে ছিলাম এবং কেন তাকে এভাবে ফেলে গিয়েছিলাম? আসলে আমার সকল সৃষ্টিশীলতার পেছনে সরলারই বড় ভূমিকা রয়েছে। তার সহযোগিতা না পেলে আমি কখনোই গান-বাজনা করতে পারতাম না। এজন্য মৃত্যুর পর সরলাকে আমি দাফন করেছি আমার ঘরের সামনে উঠোনে, যাতে ঘর থেকে বেরুলেই সর্বপ্রথম তাকে দেখতে পাই।’ আজ ১২ সেপ্টেম্বর বাউলগানের সেই কিংবদন্তি সাধক শাহ আবদুল করিমের ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৯ সালের এই দিনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

#প্রাথমিক_জীবন
শাহ আবদুল করিম ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সুনামগঞ্জের দিরাই থানার ধলাশ্রম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ইব্রাহীম আলী ও মাতার নাম নাইওরজান। চরম দারিদ্র্য ও জীবন সংগ্রামের মাঝে বড় হওয়া বাউল শাহ আবদুল করিমের সঙ্গীত সাধনার শুরু ছেলেবেলা থেকেই। বাউলসম্রাটের প্রেরণা তার স্ত্রী, যাকে তিনি আদর করে ‘সরলা’ বলে ডাকতেন। ১৯৫৭ সাল থেকে শাহ আবদুল করিম তাঁর জন্মগ্রামের পাশের উজানধল গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

শাহ আবদুল করিমের লেখা গান ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখপ্রেম-ভালবাসার পাশাপাশি কথা বলে সকল অন্যায়-অবিচার, কুসংস্কার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরূদ্ধে। তিনি গানের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন প্রখ্যাত বাউলসম্রাট ফকির লালন শাহ, পুঞ্জু শাহ এবং দুদ্দু শাহ এর দর্শন থেকে। যদিও দারিদ্র্য তাঁকে বাধ্য করে কৃষি কাজে তাঁর শ্রম ব্যয় করতে কিন্তু কোন কিছু তাঁকে গান সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তিনি বাউলগানের দীক্ষা লাভ করেছেন সাধক রশীদ উদ্দীন, শাহ ইব্রাহীম মাস্তান বকশের কাছ থেকে। তিনি শরীয়তি, মারফতি, দেহতত্ত্ব, গণসংগীতসহ বাউল গান এবং গানের অন্যান্য শাখার চর্চাও করেছেন।

#সঙ্গীত_সাধনা
স্বশিক্ষিত বাউল শাহ আব্দুল করিম এ পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক গান লিখেছেন এবং সুরারোপ করেছেন। বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে তাঁর ১০টি গান ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। কিশোর বয়স থেকে গান লিখলেও কয়েক বছর আগেও এসব গান শুধুমাত্র ভাটি অঞ্চলের মানুষের কাছেই জনপ্রিয় ছিল। তাঁর মৃত্যুর কয়েক বছর আগে বেশ কয়েক জন শিল্পী বাউল শাহ আব্দুল করিমের গানগুলো নতুন করে গেয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করলে তিনি দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন।

বাউলসাধক শাহ আবদুল করিম আজন্ম লড়াই করেছেন দরিদ্র্যের সাথে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময় তাঁর সাহায্যার্থে এগিয়ে এলেও তা কখনো গ্রহণ করেননি। উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে সাউন্ড মেশিন নামের একটি অডিও প্রকাশনা সংস্থা তাঁর সম্মানে জীবন্ত কিংবদন্তী : বাউল শাহ আবদুল করিম নামে বিভিন্ন শিল্পীর গাওয়া তাঁর জনপ্রিয় ১২টি গানের একটি অ্যালবাম প্রকাশ করে। এই অ্যালবামের বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ তাঁর বার্ধক্যজনিত রোগের চিকি‍ৎসার জন্য পরিবারের কাছে তুলে দেয়া হয়। ২০০৭ সালে জীবদ্দশায় শাহ আবদুল করিমের জীবন ও কর্মভিত্তিক একটি বই প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হয়, ‘শাহ আবদুল করিম সংবর্ধন-গ্রন্থ’ (উৎস প্রকাশন) নামে। বইটি সম্পাদনা করেন লোকসংস্কৃতির গবেষক ও প্রাবন্ধিক সুমনকুমার দাশ। শিল্পীর চাওয়া অনুযায়ী ২০০৯ সালের ২২ মে সিলেট বিভাগীয় কমিশনার ও খান বাহাদুর এহিয়া ওয়াকফ এস্টেটের মোতাওয়াল্লি ড. জাফর আহমেদ খানের উদ্যোগে তাঁরর সমগ্র সৃষ্টিকর্ম নিয়ে গ্রন্থ ‘শাহ আবদুল করিম রচনাসমগ্র’ নামে প্রকাশিত হয়। বইটির পরিবেশক বইপত্র।

#জনপ্রিয়_গান
বন্দে মায়া লাগাইছে, আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম, গাড়ি চলে না, রঙ এর দুনিয়া তরে চায় না, তুমি রাখ কিবা মার, ঝিলঝিল ঝিলঝিল করেরে, ময়ুরপংখী নাও, তোমার কি দয়া লাগে না, আমি মিনতি করিরে, তোমারও পিরিতে বন্ধু, সাহস বিনা হয়না কভু প্রেম, মোদের কি হবেরে, মানুষ হয়ে তালাশ করলে, আমি বাংলা মায়ের ছেলে, আমি কূলহারা কলঙ্কিনী, কেমনে ভুলিবো আমি বাঁচি না তারে ছাড়া, কোন মেস্তরি নাও বানাইছে, কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু, মন মিলে মানুষ মিলে, সময় মিলে না, সখী তুরা প্রেম করিও না, কাছে নেও না ,দেখা দেও না, মন মজালে,ওরে বাউলা গান, আমার মাটির পিনজিরাই সোনার ময়নারে, নতুন প্রেমে মন মজাইয়া, বসন্ত বাতাসে সইগো, আইলায় ন, আইলায় নারে বন্ধু, মহাজনে বানাইয়াছে ময়ুরপংখী নাও, আমি তোমার কলের গাড়ি, সখী কুঞ্জ সাজাও গো, জিজ্ঞাস করি তোমার কাছে, যে দুঃখ মোর মনে, হুরু থাকতে, আমরা কত খেইর (খেইল) খেলাইতাম, হাওয়াই উরে আমার, গান গাই আমার মনরে বুঝাই, দুনিয়া মায়ার জালে, দয়া কর দয়াল তোমার দয়ার বলে, আগের বাহাদুরি গেল কই, মন বান‍দিব কেমনে, আমার মন উদাসি, আমি তরে চাইরে বন্ধু, কাঙ্গালে কি পাইব তোমারে, বন্ধুরে কই পাব, এখন ভাবিলে কি হবে, আসি বলে গেল বন্ধু আইলনা, আমি কি করি উপায়, প্রাণ বন্ধু আসিতে কত দূরে, বন্ধু ত আইলনাগু সখী, আমি গান গাইতে পারিনা, খুঁজিয়া পাইলাম নারে বন্ধু, ভব সাগরের নাইয়া।

#প্রকাশিত_গ্রন্থাবলি
বাউল শাহ আবদুল করিমের এ পর্যন্ত ৭টি গানের বই প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন আগে সিলেট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে তাঁর রচনাসমগ্র (অমনিবাস)-এর মোড়ক উন্মোচিত হয়। এছাড়াও সুমনকুমার দাশ সম্পাদিত শাহ আব্দুল করিম স্মারকগ্রন্থ (অন্বেষা প্রকাশন) তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। এর আগে-পরে তাঁকে নিয়ে সুমনকুমার দাশের বাংলা মায়ের ছেলে : শাহ আবদুল করিম জীবনী (অন্বেষা প্রকাশন), সাক্ষাৎকথায় শাহ আবদুল করিম (অন্বেষা প্রকাশন), শাহ আবদুল করিম (অন্বেষা প্রকাশন), বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম (উৎস প্রকাশন), গণগীতিকার শাহ আবদুল করিম (উৎস প্রকাশন) প্রকাশিত হয়। সর্বশেষ ২০১৬ সালে ঢাকার প্রখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা প্রথমা থেকে প্রকাশিত হয় সুমনকুমার দশের ‘শাহ আবদুল করিম : জীবন ও গান’ বইটি। এ বইটি ইতোমধ্যেই একটি প্রামণ্য জীবনী হিসেবে বোদ্ধামহলে স্বীকৃতি পেয়েছে। এ বইটিতে শাহ করিমের নির্বাচিত বেশ কিছু গানও সংকলিত হয়েছে। তাঁর জীবন ভিত্তিক প্রথম উপন্যাস সাইমন জাকারিয়া রচিত “কূলহারা কলঙ্কিনী” প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭ সালে।

#বইয়ের_তালিকা
আফতাব সঙ্গীত (১৩৫৫ বাংলা; আনুমানিক ১৯৪৮), গণ সঙ্গীত (১৯৫৭), কালনীর ঢেউ (১৩৮৮ বঙ্গাব্দের আশ্বিন, ১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বর), ধলমেলা (১৩৯৬ বঙ্গাব্দের ১ ফাল্গুন, ১৯৯০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি), ভাটির চিঠি (১১ বৈশাখ ১৪০৫, ২৪ এপ্রিল ১৯৯৮), কালনীর কূলে (নভেম্বর ২০০১), শাহ আব্দুল করিম রচনাসমগ্র (সংকলন ও গ্রন্থন : শুভেন্দু ইমাম, ২২ মে ২০০৯)।

#সম্মাননা
বাউল শাহ আব্দুল করিম ২০০১ সালে একুশে পদক লাভ করেন। বাংলা একাডেমি তাঁর দশটি গানের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করে। শাকুর মজিদ তাঁকে নিয়ে নির্মাণ করেছেন ভাটির পুরুষ নামে একটি প্রামাণ্য চিত্র। এছাড়াও সুবচন নাট্য সংসদ তাঁকে নিয়ে শাকুর মজিদের লেখা মহাজনের নাও নাটকের ৮৮টি প্রদর্শনী করেছে।

অমর সংগীতপ্রেমী শাহ আবদুল করিম একুশে পদক ছাড়াও কথা সাহিত্যিক আবদুর রউফ চৌধুরি পদক (২০০০), রাগীব-রাবেয়া সাহিত্য পুরস্কার (২০০০), লেবাক অ্যাওয়ার্ড (২০০৩), মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার আজীবন সম্মাননা (২০০৪), সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস আজীবন সম্মাননা (২০০৫), বাংলাদেশ জাতিসংঘ সমিতি সম্মাননা (২০০৬), খান বাহাদুর এহিয়া পদক (২০০৮), বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননা (২০০৮), হাতিল অ্যাওয়ার্ড (২০০৯), এনসিসি ব্যাংক এনএ সম্মাননা (২০০৯) পেয়েছেন।

#মৃত্যুবরণ
২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম মৃত্যু বরণ করেন। ওইদিন শনিবার সকাল ৭টা ৫৮ মিনিটে সিলেটের একটি ক্লিনিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সিলেটের নূরজাহান পলি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন আব্দুল করিমকে ১১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার দুপুর থেকেই লাইফসাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়ে ছিল।

__ লেখক ©️ আহমেদ জহুর
azohur2002@gmail
————————————————————-
#ছবি : গুগল থেকে সংগৃহীত….

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত