বুধবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ১২ ফাল্গুন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শ্রীমঙ্গলে হবে ‘টেস্টটিউব বেবি….ডা. বিনেন্দু ভৌমিক।



আমি তখন বিসিএস পাশ করে শ্রীমঙ্গলে পা দিয়েছি সবে। ডিম ফোটে পাখির ছানার মতো ডানা ঝাপটাতে শুরু করেছি কিছুটা। এসে দেখি একজন ছোটোখাটো মতন মানুষ, মাথায় চুল কম, গলার স্বর গমগমে, একটা চা বাগানে ‘জব’ করেন মেডিকেল অফিসার হিসাবে। তাঁর কথা বলার ধরণ বেশ ‘পশ’। জড়তা নেই মোটেও। প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেছেন কিছুদিন, এখন আর করেন না। কারণ দিনরাত খালি পড়েন আর পড়েন, আর ফিবছর গাইনিতে এফসিপিএস পরীক্ষা দেন। আমার তখন দুচারজন করে রোগী হচ্ছে। একটু-আধটু করে পয়সাও আসতে শুরু করেছে। একটা হামবড়া ভাবও ভেতরেভেতরে চাগাড় দিচ্ছে। তাই হাস্যমুখে মিশলেও এই হিটলার-জাতীয় উচ্চতার মানুষটিকে বড় একটা ‘কাউন্ট’ করতাম না হয়ত।

ওদিকে তাঁর অধ্যবসায় চলছে নিরলস। একদিন এক রৌদ্রকরোজ্জ্বল মাহেন্দ্রক্ষণে তিনি পাশ করে ফেললেন— এফসিপিএস। এরকম অজপাড়াগাঁয়ে থেকে, এক বিকল্প স্রোতধারার উজানে নাও বেঁয়ে খুব বেশি মানুষ চিকিৎসাশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিতে পারেন না। অন্তঃত সেই ধীশক্তিটা কারুর শেষমেশ অবশিষ্ট থাকে না। তিনি পেরেছেন। এটাই তাঁর আলাদা হবার বিসদৃশ ‘ক্রাইটেরিয়া’। যাই হোক, তাঁরও ব্যস্ততা বাড়া শুরু হলো। একসময় শুরু হলো শনৈ শনৈ ডাক। এই ক্লিনিক, সেই ক্লিনিক। সরস্বতীর ভাঁড়ারে লক্ষ্মীও গা গলিয়ে ঢুকতে লাগলেন ক্রমশঃ। আর, কী উচ্চতায়, কী যোগ্যতায়—আমরা ক্রমেই তাঁর থেকে পিছোতে লাগলাম। এ পেছানো আগেকার বিঘত পরিমাণ থেকে গিয়ে ঠেকলো যোজন যোজন দূরে।

আর এই দূরত্ব বাড়ার অয়ষ্কঠিন সময়ে, শ্রীমঙ্গলের কলেজরোডে তাঁর শিল্পীত হাত ধরে ‘হাঁটিহাঁটি পা পা’ করে তৈরি হতে লাগলো ‘দীপশিখা ইনফার্টিলিটি সেন্টার’। আমরা তখনও আড়চোখে চাই। বঙ্কিম কটাক্ষও কী করি নি? এ অঞ্চলে এটা কি চলবে? একটু বেশি আদিখ্যেতা যেন!! তিনি কিন্তু দমেন না। মফস্বলের বাগানের এক জৌলুসহীন চাকুরে নিজ প্রচেষ্টার গুণে আজ IVF, সহজ কথায় ‘টেস্ট টিউব’ বেবীর নতুন দ্বারের উন্মোচন করে ফেললেন এই সেন্টারেই। অনেক সন্তানহীন মা-বাবার মুখে ফুটবে পরম প্রাপ্তির স্মিত হাসি, এটা যে এখন স্বপ্ন নয়, বাস্তব।

সুইজারল্যান্ডের দুটো প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান নাকি তাদের জিডিপি’র ৯৬ শতাংশরই পৃষ্ঠপোষক। এক—দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘নেসলে’, আর দুই হলো রিসার্চ বেইজড ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ‘হফম্যান লা রোশ’। যখন কোনো প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে যায়, তখন তা ঐ প্রতিষ্ঠানটির মালিকপক্ষের জন্যই লাভদায়ক হয় না, বরং সেই এলাকার, এমনকি সেই দেশের মাথাপিছু গড় আয়কে বাড়িয়ে দেয় দ্বিগুণ, চৌগুণ।

দীপশিখ ইনফার্টিলিটি সেন্টার এমনটিই হোক, আমার মতো দুরাত্মাও যে এখন এই কামনা অন্তর থেকে করে।

ভালো থাকুন নিবাসদা, আমার, আমাদের অনেকেরই প্রিয়মুখ Dr. Nibash Paul। আপনাকে আমাদের আর ‘কাউন্ট’, করতে হবে না, আমরাই যে আপনার ‘কাউন্ট’-এ ঢোকার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছি আজ নয়, আজকে থেকে আরো বহু বহুদিন আগে।*
**********************************
লেখক পরিচিতি ;- মৌলভীবাজার জেলার সর্বজন পরিচিত ও প্রিয় মুখ ডা. বিনেন্দু ভৌমিক। তিনি যেমনি একজন ভালো চিকিৎসক তেমনি একজন ভালো গায়ক এবং একজন মানবিক সমাজসেবক ও সাদা মনের মানুষ।************************

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত