মঙ্গলবার, ৫ অক্টোবর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ২০ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

আজ কিংবদন্তি চিকিৎসক ও বুদ্ধিজীবি শহীদ অধ্যাপক ডাঃ ফজলে রাব্বির জন্মদিন।



লিখেছেন-আহমাদ ইশতিয়াক

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের দুইদিন পর ১৮ই ডিসেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে অজস্র লাশের ভিড়ে পাওয়া গিয়েছিলো একটি লাশ।
.
লাশটির দুই চোখ উপড়ানো। সমগ্র শরীরে জুড়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আঘাতের চিহ্ন। দু হাত পিছনে গামছা দিয়ে বাঁধা। লুঙ্গিটা উরুর উপরে আটকানো। হৃদপিন্ড আর কলিজাটা ছিঁড়ে ফেলেছে হানাদার ও নিকৃষ্ট আলবদরেরা।
.
লাশটি ছিলো ছবির এই ভদ্রলোকের। বিশ্বখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট শহীদ অধ্যাপক ডাঃ ফজলে রাব্বি।
.
এই ফজলে রাব্বি তিনি, সমগ্র পাকিস্তানকে সাত বার আটি দরে বিক্রি করলেও তাঁর মস্তিষ্কের দাম উঠবে না৷ সেই ফজলে রাব্বি তিনি যিনি হতে পারতেন বাংলাদেশের প্রথম নোবেলজয়ী চিকিৎসা বিজ্ঞানী।
.
তিনি ছিলেন ঢাকা মেডিকেলের এমবিবিএস চূড়ান্ত পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অধিকারী ছাত্র। মাত্র ৩২ বছর বয়সে ১৯৬৪ সালে মেডিসিনের উপর তাঁর বিখ্যাত কেস স্টাডি ‘A case of congenital hyperbilirubinaemia ( DUBIN-JOHNSON SYNDROME) in Pakistan’ প্রকাশিত হয়েছিলে বিশ্বখ্যাত গবেষণা জার্নাল ‘জার্নাল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন হাইজিন’ এ।
.
মাত্র ৩৮ বছর বয়সে ১৯৭০ সালে তাঁর বিশ্বখ্যাত গবেষণা Spirometry in tropical pulmonary eosinophilia প্রকাশিত হয়েছিলো ব্রিটিশ জার্নাল অফ দা ডিসিস অফ চেস্ট ও ল্যান্সেট এ।
১৯৭০ সালে মাত্র ৩৮ বছর বয়সেই ডাঃ ফজলে রাব্বি মনোনীত হয়েছিলেন পাকিস্তানের সেরা অধ্যাপক পুরস্কারের জন্য। কিন্তু তাঁর আত্মায় ছিলো বাংলার অসহায়র্ত মানুষ। ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেছিলেন তিনি সেই পুরুষ্কার।
.
মাত্র ৩৯ বছর বয়সী ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রফেসর অব ক্লিনিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড কার্ডিওলজিস্ট। আজকের দিনে কল্পনা করা যায়?
.
মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় তিনি আহত মানুষদের সেবা দিয়েছেন মেডিকেলে বসে। বেশ কয়েকদফা নিজের সাধ্যের চেয়ে বেশী ঔষধ আর অর্থ সহায়তা দিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় গোপন রেখে দিয়েছিলেন চিকিৎসাও।
.
মুক্তিযুদ্ধের ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর ডাঃ ফজলে রাব্বির স্ত্রী জাহানারা রাব্বী একই স্বপ্ন দুবার দেখলেন। স্বপ্নটা এমন একটা সাদা সুতির চাদর গায়ে তিনি তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে জিয়ারত করছেন এমন একটা জায়গায়, যেখানে চারটা কালো থামের মাঝখানে সাদা চাদরে ঘেরা কী যেন।
.
১৫ই ডিসেম্বর সকালে জাহানারা রাব্বী এ স্বপ্নের কথা বললেন ফজলে রাব্বিকে। রাব্বি বললেন, ‘তুমি বোধ হয় আমার কবর দেখেছ’। ভয় পেলেন জাহানারা রাব্বি। টেলিফোন টেনে পরিচিত অধ্যাপকদের বাড়িতে ফোন করতে বললেন।
.
ফজলে রাব্বি ফোন করলেন, কিন্তু কাউকেও লাইনে পাওয়া যাচ্ছেনা।
.
আকাশে তখন ভারতীয় যুদ্ধবিমান। রকেট, শেলের শব্দে কান ঝালাপালা। সকাল ১০টায় ২ ঘন্টার জন্য কারফিউ উঠলো। ফজলে রাব্বি স্ত্রীকে বললেন, ‘একজন অবাঙালি রোগী দেখতে যাবো পুরান ঢাকায়।’ যেতে মানা করলেন জাহানারা রাব্বি।

ফজলে রাব্বি কথার এক প্রসঙ্গে বলেছিলেন ‘ভুলে যেয়ো না, ওরাও মানুষ।’
সেদিব তিনি ফিরেছিলেন কারফিউ শুরু হওয়ার আগেই।
.
দুপুরের খাবার ছিলো আগের দিনের বাসি তরকারি। কিন্তু ফজলে রাব্বি উল্টো বলেছিলেন, ‘আজকের দিনে এত ভালো খাবার খেলাম।’
জাহানারা রাব্বি দেখলেন এখানে থাকা বিপজ্জনক। তিনি বললেন, চলো চলে যাই। ফজলে রাব্বি বলেছিলেন ‘আচ্ছা, দুপুরটা একটু গড়িয়ে নিই।’
.
কিছুক্ষণ পর বাবুর্চি এসে বললো ‘সাহেব, বাড়ি ঘিরে ফেলেছে ওরা।’
বাইরে তখন কাদালেপা মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে। মাইক্রোবাসের সামনে রাজাকার, আলবদর আর হানাদারেরা।
.
খুব হালকা স্বরে ফজলে রাব্বি জাহানারা রাব্বিকে বলেছিলেন, ‘আমাকে নিতে এসেছে।’ এরপর
দারোয়ানকে গেট খুলে দিতে বলেছিলেন তিনি। যখন মাইক্রোবাসে তিনি উঠলেন তখন সময় ঘড়িতে বিকেল চারটা।
.
১৮ই ডিসেম্বর ডাঃ ফজলে রাব্বির লাশটি পাওয়া গিয়েছিলো রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে। দুই চোখ উপড়ানো। সমগ্র শরীরে জুড়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আঘাতের চিহ্ন। দু হাত পিছনে গামছা দিয়ে বাঁধা। লুঙ্গিটা উরুর উপরে আটকানো। তাঁর হৃদপিন্ড আর কলিজাটা ছিঁড়ে ফেলেছে হানাদার ও নিকৃষ্ট আলবদরেরা।
.
এই সেই ডাঃ ফজলে রাব্বি, যাঁর গোটা হৃদয় জুড়ে ছিলো বাংলাদেশ আর অসহায়র্ত মানুষ। যার হৃদয় জুড়ে ছিলো স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন। হানাদার ও আল বদরের ঘৃণ্য নরপিশাচেরা সেই হৃদয়কে ছিঁড়ে ফেললেই কি সমগ্র বাংলার মানুষের হৃদয় থেকে কি তাঁকে বিছিন্ন করা যায়। যায়না। হাজার বছর পরেও ডাঃ ফজলে রাব্বি থাকবেন আমাদের প্রাণে, হৃদয়ের গহীনে।
.
আজ কিংবদন্তি চিকিৎসক ও বুদ্ধিজীবি শহীদ অধ্যাপক ডাঃ ফজলে রাব্বির জন্মদিন। জন্মদিনে নতচিত্তে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এই কিংবদন্তি চিকিৎসককে। 🙏💞

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত