Saturday, September 23, 2017

সুনামগঞ্জে পাউবোর সিন্ডিকেটচক্রের ভাগীদারের হাতে কোরবানীর পশুর হাট

সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা:: সুনামগঞ্জে ভারতীয় গরু আমদানীর মাধ্যমে কোরবানীর পশুর স্থায়ী ও অস্থায়ী বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঠিকাদার ও ভাগীদার চক্র। জানা যায়,রাজধানী ঢাকার ১৫৪ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার প্রোপাইটর সাইদুল হক এর ব্যবসায়ী ফার্ম নুনা ট্রেডার্স ও নিয়াজ ট্রেডার্স এর নামে সুনামগঞ্জের হাওরের কাজ ভাগিয়ে নেয় জামালগঞ্জ উপজেলার বেহেলী গ্রাম নিবাসী শহরের নতুনপাড়া এলাকার বর্তমান বাসিন্দা ঠিকাদার ভজন রায় ও তার স্থানীয় একজন পার্টনার (ভাগীদার)। শহরের আরপিননগর আবাসিক এলাকার ঐ ভাগীদার বিভিন্ন কৌশলে এবার ইব্রাহিমপুর গ্রামের ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমান ছুটল মিয়ার নামে সারা জেলার অর্ধেকের চাইতে বেশী হাটবাজার বেআইনীভাবে ইজারা নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কাগজেপত্রে ছুটল মিয়ার নামে জেলার বিভিন্ন হাটবাজার ও পশুর হাট ইজারা নেয়া হলেও আরপিননগরের ঐ ভাগীদারের নেতৃত্বে প্রতিবছর কোরবানীর হাটে নাশকতা চালানো হয়। ইজারাচুক্তি লঙ্গন করে এই সিন্ডিকেট প্রতিবছর কোরবানীর হাটে ক্রেতা বিক্রেতা উভয়কে আগ্নেয়াস্ত্রের মুখে জিম্মি করে টাকা হাতিয়ে নেয়। প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে চোরাই পথে আমদানীকৃত ভারতীয় গরু বিক্রির মহোৎসব চালায় এচক্রটি। এলক্ষ্যে তারা শত শত ভারতীয় গরু বিভিন্ন গোপন জায়গায় মজুত করে রেখেছে বলে গোপনসুত্রে জানা গেছে।
জয়নগর বাজারে পূর্বে বুধবার ও বৃহস্পতিবার হাট বসলেও এবার রবিবারও পশুর হাট বসাচ্ছে স্থানীয় চেয়ারম্যান নুরুল হকের ভাতিজা ও ইজারাদার জাভেদ আহমদ কফিল। বুধ ও শনিবার হাট বসে কাঠইর ইউনিয়নের শ্রীমতি বাজারে। এখানে কোরবানীর পশুর হাটে গরু ও ছাগলের মূল্য তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এছাড়া সরকারের নির্ধারিত শতকরা ৭টাকার স্থলে শ্রীমতি বাজারের কমিটির লোকজন মাত্র ২% হারে ক্রেতাদের কাছ থেকে ইজারামূল্য আদায় করে পশুর হাট জমিয়ে দিয়েছেন। ইজারামূল্য একেবারেই কম নেয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে শ্রীমতি বাজারের সভাপতি হাজী ইসমাইল আলী ও সাধারন সম্পাদক মোঃ লুৎফুর রহমান জানান,আমরা ইজারামূল্যের চাইতে কোরবানীদাতাদের সেবা দেয়াটাকে বড় মনে করছি। গতবার শ্রীমতি বাজার খাস কালেকশনে ছিল। এইবার আমরা নিজেরা লীজ নিতে পারতাম। কিন্তু ইব্রাহিমপুরের ছোটল মিয়াগং আমাদেরকে টেন্ডারে অংশ নিতে দেননি। তারা বলেছেন আমরা কাগজেপত্রে ইজারা পেলেও বাজার কমিটির লোকজনকে নিয়েই শ্রীমতি বাজার পরিচালনা করবো।
জানা যায়,সারা জেলায় কোরবানীর পশুর হাট হচ্ছে ১৭টি। বড় হাট বসে ছাতক উপজেলার জাউয়াবাজারে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ৪টি স্থায়ী ও ৪টি অস্থায়ী হাটবাজার রয়েছে। স্থায়ী হাটগুলো হচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের মঙ্গলকাটা,গৌরারং ইউনিয়নের টুকের বাজার, মোহনপুর ইউনিয়নের জয়নগর বাজার ও কাঠইর ইউনিয়নের শ্রীমতি বাজার। এর মধ্যে দোয়ারাবাজার উপজেলার আমবাড়ী,সদর উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের মঙ্গলকাটা বাজার,শ্রীমতি বাজার ও টুকেরবাজারও ইজারা পেয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভাগীদারচক্র।
সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় সুত্র জানায়,গত বৎসর স্থায়ী হাটগুলোর পাশাপাশি ৬টি অস্থায়ী হাট বসানো হয়েছিল। এবার মাত্র ৪টি অস্থায়ী হাটের আবেদন পাওয়া যায়, সদর উপজেলার কোরবাননগর ইউনিয়নের গোদাইরগাও গ্রামে পীরগঞ্জ বাজার পশুর হাট বসানোর জন্য ইউপি সদস্য আব্দুল কাইয়্যুম, লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের নীলপুর বাজার পশুর হাট স্থাপনের জন্য প্রপেসর আব্দুল বারীক,রঙ্গারচর ইউনিয়নের নৈগাং বাজার পশুর হাট স্থাপনের জন্য নজরুল ইসলাম ও কোরবাননগর ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগাঁও বাজার পশুর হাট স্থাপনের জন্য গ্রামবাসী সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে আবেদন করেছেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত জাহান আবেদনগুলোর অনুকূলে অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে অনুমোদন চেয়ে পত্র প্রেরন করেছেন। কিন্তু সিন্ডিকেট চক্রের অসাধু ইজারাদার ও তাদের ভাগীদাররা কোরবানীর হাটকে ভিত্তি করে ইজারার নামে মোটা অঙ্কের টাকা চাঁদাবাজীর লক্ষ্যে অস্থায়ী হাটের কোন অনুমোদন না দেয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার শাখায় তদবীর বাণিজ্য অব্যাহত রেখেছে।
একাধিক হাটবাজারের ইজারা সিন্ডিকেটচক্র কর্তৃক ভাগিয়ে নেয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে টেন্ডারে অংশগ্রহন করতে না পারা সাবেক ইজারাদাররা বলেন,এবার হাটবাজার ইজারাদানের সময় সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত জাহান ভারতে ছিলেন। এ সুযোগে অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা ঘুষের বিনিময়ে আমাদের দরপত্রের গোপনীয়তা সিন্ডিকেট চক্রের হাতে তুলে দিয়ে তাদেরকে বেআইনীভাবে হাটবাজারের ইজারা গ্রহনে সহযোগীতা করে। এছাড়া ইজারাদারের ভাগীদার ইউএনও অফিসে গিয়ে নিজেকে আরপিননগরের প্রভাবশালী ব্যক্তি পরিচয়ে দরপত্রে অংশগ্রহনকারীদেরকে খুন করার ভয় প্রদর্শন করে আগ্রহী দরপত্রদাতাদেরকে দরপত্রে অংশগ্রহন করতে মারাত্মকভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন।
এদিকে ঈদুল আযহার ৪ দিন আগে সুনামগঞ্জ পৌরসভা এলাকায় অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর জন্য একইচক্র ইজারা হাতিয়ে নেয়। এখানেও এই চক্রের দাপটে দরপত্রে আগ্রহীরা অংশ নিতে পারেনি। গতবার পুলিশ লাইন ময়দানে এর আগেরবার ষোলঘর স্কুল মাঠে পশুর হাট বসাতে গিয়ে এচক্র এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ ঘোলাটে করে। এবং তারা আইন শৃংখলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটায়। তাছাড়া পশুর হাট শেষ হওয়ার পর ইজারাদার বা পৌরসভা কোনপক্ষই মাঠগুলোকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনেনা। অনেক সময় স্থানীয় জনগনের একমাস সময় লেগে যায়,গরুর গোবর ও কাাঁদা ভর্তি রাস্তাগুলোকে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে নিতে। তাছাড়া যান চলাচলে ঘটে থাকে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা। একারনে এবার তাদেরকে ঐসব এলাকায় হাট বসাতে দেয়নি প্রশাসন। কিন্তু এইবার জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে হাট বসানোর কথা বলে এচক্র শহরে মাইকিং ও প্রচারাভিযান চালায়। এতে শহরবাসী নতুন করে আবারও আতংকে ভূগছেন। তারা জানতে চেয়েছেন জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কত টাকার বিনিময়ে জুবিলী স্কুলের মতো শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পশুর হাট বসানোর অনুমতি দিয়েছেন। কোরবানীর হাটকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয় এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত ও আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে এর দায় দায়িত্ব আসলে কে নিবে। অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মফিজুল হক মোল্লা বলেন,ইজারাদাররা কষনও কোন আর্থিক বেনেফিট বিদ্যালয়কে দেয়নি। এবারতো অবশ্যই না। তিনি বলেন,আমি এবং আমার শিক্ষকদের প্রবল আপত্তির মুখে আমাদের মাঠ ইজারাদারদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। আমরা আশংকা করছি মাঠে লাগানো মূল্যবান গাছগুলি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আরো মারাত্মক ক্ষতি হবে। সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র আয্যুব বখত জসলুল বলেন,ইজারাদাররা তাদের ইজারাচুক্তির শর্ত পালন করে ব্যবসা করা উচিত। এমনকি পশুর হাট বসানোর ফলে স্থানে স্থানে যে বর্জের সৃষ্টি হয় সেগুলোও ইজারাদারের অপসারনের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চেয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দায়িত্বরত স্থানীয় সরকার বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোঃ কামরুজ্জামান ও সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত জাহানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করেও তাদের কোন বক্তব্য জানা যায়নি। স্থানীয় জনগনের দাবী জেলা প্রশাসন স্থানীয় জনমতকে উপেক্ষা করে জুবিলীর মাঠকে হাট বানানোর পায়তারায় লিপ্ত হয়েছে। অবিলম্বে ঘোষণা দিয়ে পশুর হাটকে শহরের নিরিবিলি জায়গায় সরানোর দাবী জানিয়েছেন জনগন। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি কোনদিকে মোড় নেয় সেদিকে দৃষ্টি এখন সকলের।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত

সর্বশেষ সংবাদ

September 2017
M T W T F S S
« Aug    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930