Wednesday, June 20, 2018

‘টাকা নিয়ে হাত কাঁপছিল বার বার’

খেলাধুলা ডেস্ক::বিপিএলে রাজশাহী কিংসের হয়ে ১৪৩ কি.মি গতিতে বল করার পর সবাই নড়ে চড়ে বসেন-কে এই হোসেন আলী? মাত্র ৪ ম্যাচ খেলার সুযোগ হয়েছে। তবে তার শিকার করা ৪ উইকেট সংখ্যা বিচারে নয় আলোচনায় এসেছে গতি দিয়ে।

পিঠের ব্যথা না থাকলে হয়তো আরো কিছু ম্যাচ খেলার সুযোগ হতো। ২০’ ছুঁই ছুঁই এ তরুণ নরসিংদীর ঘোড়াশালের ছোট্ট এক গ্রাম থেকে উঠে এসেছেন মাশরাফি, শোয়েব আকতার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। সেই স্বপ্নের কথা বলেছেন স্পোর্টস রিপোর্টার ইশতিয়াক পারভেজের সঙ্গে। সেই কথপোকথনের মূল অংশ তুলে ধরা হলো-

প্রশ্ন: ক্রিকেট খেলা শুরু কিভাবে?

হোসেন আলী: আমার জন্ম নরসিংদীর ঘোড়াশালে। ছোট বেলা থেকেই পাড়ার মাঠে ক্রিকেট খেলতাম। আমি তখন ব্যাটিং করতাম, বোলিং করতামই না। আমার ব্যাটিং দেখে গ্রামের বড় কয়েকজন ভাই বলেছিল ক্রিকেটে ভর্তি হতে। পরে আমার বাসা থেকে ক্রিকেটের কোচিংয়ে ভর্তি করে দেয়। তখনো আমি ব্যাটিংই করি। একদিন একজন বোলার নেই, আমার কোচ বললেন বল করতে। বল করলাম।

আমার বল করার পর কোচ বলে দিলেন এখন থেকে বল করতে হবে। সেখান থেকেই বোলিং শুরু, ব্যাটিং করি মাঝে মাঝে। বেশ ভালো করছিলাম। বিকেএসপি থেকে আসে আঞ্চলিক ক্রিকেটারদের খোঁজে। সেখানে আমি নরসিংদী থেকে ২ নম্বরে ছিলাম। এরপর চট্টগ্রাম বিকেএসপিতে ২ মাস ট্রেনিংও অনেক ভালো করি। আমাকে বলা হয় বিকেএসপিতে ভর্তি হতে। কিন্তু যেদিন রাতে বলেছিল ঠিক তার পর দিনই আমাকে না করে দেয়া হয়। কেন না করেছিল জানি না। তবে থামিনি, খেলা চালিয়ে গেছি।

প্রশ্ন: ঢাকায় খেলার সুযোগ পেলেন কিভাবে?

হোসেন আলী: আমি ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ খেলছিলাম, একটি ম্যাচে কোচ আমির বাবু স্যার আমার বোলিং দেখে দারুণ প্রশংসা করে। তখন তিনি আমাকে ঢাকা নিয়ে এসে খেলানোর কথা বলেন। এরপর আমি স্যারের পেছনে লেগে থাকি। স্যারকে বিরক্ত করতে থাকি। স্যারও বলতেন যে সুযোগ হবে।

একদিন স্যার আমাকে বলেন যে, নেট বোলার হিসেবে আমাকে সুযোগ করে দিবেন। তিনি আমার কথা নান্নু স্যার (মিনহাজুল আবেদিন) ও বাশার (হাবিবুল বাশার সুমন) স্যারকে বলেছেন। আমি বাশার স্যারকে কল করি। তিনি আমাকে মিরপুরে আসতে বলেন। আমি এতটাই উত্তেজিত ছিলাম যে ২ ঘণ্টা আগে চলে আসি। তখন ২০১৬ সাল মাত্র শুরু। মিরপুর মাঠের গেটে এসে ভেবেছিলাম ক্রিকেটার বললে ঢুকতে দিবে। কিন্তু দিলো না, তখন বাশার স্যার এসে আমাকে নিয়ে যান।

প্রশ্ন: নেট বোলিংয়ের প্রথম দিন কিভাবে কাটে?

হোসেন আলী: আমি মাঠে এসে বসি। নেটে বল করার কথা। কিন্তু সব ব্যাটসম্যান অনুশীলন করে চলে যায়। তখন ভেবেছিলাম হয়তো বল করাবে না। কিন্তু আমাকে বল করার সুযোগ দেয় যখন বোলাররা ব্যাটিং অনুশীলন করতে আসে। আমি ৮ বল করেছি। প্রথম বল করতে গিয়ে তাল সামলাতে না পেরে পড়ে গিয়েছিলাম। পরে ঠিক ভাবেই করেছি। একটি বলের গতি এত বেশি ছিল যে রনির (আবু হায়দার) ব্যাটের নিচের অংশ ভেঙে যায়।

সেদিনই আমাকে জানিয়ে দেয়া হয় পর দিন যেন সকালে চলে আসি। আমি তারপর দিনও এক ঘণ্টা আগে চলে আসি। এসে দেখি বোর্ডে রুবেল ভাই, তাসকিন ভাইদের নামের নিচে ‘এইচ আলী লেখা’। আমি ভেবে ছিলাম এটা অন্য কারো নাম। তাই দূরে গিয়ে বসে অপেক্ষা করছিলাম। হঠাৎ আমাকে ডেকে নেয়া হয়। তখন বুঝি যে সেটা আমার নাম। এরপর অনেক সুযোগ পেয়েছি। এনসিএল খেলেছি, ঢাকা প্রিমিয়ার লীগে খেলেছি। এবার প্রথম বিপিএলে খেললাম।

প্রশ্ন: পরিবার থেকে ক্রিকেটে কতটা সহযোগিতা পান?

হোসেন আলী: আমার বাবা মারা গেছেন অনেক ছোট বেলাতে। তখন আমি ক্লাস থ্রিতে পড়ি। মা আছেন। আর চার ভাই- বোনের মধ্যে সবার ছোট আমি। তাই ক্রিকেট খেলতে অনেক উৎসাহ পেতাম। কিন্তু অনেক দিন যখন হয়ে গেল, কিছু করতে পারছিলাম না, ঢাকাতেই আসতে পারিনি তখন বাসা থেকে বলে ক্রিকেট ছেড়ে দিতে। বলেছিল, ক্রিকেট হবে না, এবার পড়া লেখাতে মন দিয়ে কিছু কর।

কারণ ক্রিকেটের জন্য আমার পরীক্ষা দেয়া হতো না। কিন্তু ২০১৬ তে আমির বাবু ও বাশার স্যার যদি সুযোগ না দিতেন তাহলে হয়তো এখন আর ক্রিকেট খেলতে পারতাম না। এখন পড়া লেখাটাও করছি। এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিবো।

প্রশ্ন: চার প্রথম শ্রেণি ম্যাচে ৬টি ও ১০ লিস্ট এ ম্যাচে ১০টি উইকেট। বিপিএলেও চার ম্যাচে চারটি। এ পারফরম্যান্স নিজেকে খুব বেশি কি আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে?

হোসেন আলী: না, আমি এ লেভেলে কিভাবে ক্রিকেট খেলতে হয় সেটাই জানতাম না। কারণ আমার জাতীয় বয়সভিত্তিক দলে খেলার সুযোগ হয়নি। যখন এনসিএলে খেলি তখন কিছুটা বুঝতে শুরু করি। তখন নান্নু ভাইয়ের বড় ভাই নোবেল ভাই আমাকে অনেক সাহায্য করেন। এরপর গেল বছর গাজী গ্রুপ থেকে প্রিমিয়ার লীগে ডাক পাই। সেখান থেকেও অনেক কিছু নতুন করে শিখি। এবার বিপিএলে যে আমার নাম থাকবে সেটা তো কল্পনায় ছিল না। তবে নাম ছিল বলে দল পাবো আশা করিনি।

কিভাবে যেন দল পেয়ে গেলাম। প্রথম দুটি ম্যাচে আমার বোলিংয়ে ফিল্ডিং সাজাবো তা ফিল্ডারদের বলতেই সাহস পাচ্ছিলাম না। আমার সামনে মোহাম্মদ সামি, মুমিনুল ভাই, মুশফিক ভাই, ড্যারেন স্যামি কাউকে কিছু বলার সাহস পাচ্ছিলাম না। বিশেষ করে বিদেশিদের তো আরো না। পরে আমাকে মুশফিক ভাই অনেক সাহায্য করেন। আমার কথা এখন আমি শিখছি। একদিন অনেক ভালো করবো এটাই বিশ্বাস।

প্রশ্ন: এত বড় বড় ব্যাটসম্যানরা ছিল বিপিএলে ভয় পাননি?

হোসেন আলী: সত্যি কথা বলি ভয় পাইনি। আমি রাজশাহীর হয়ে প্রথম ম্যাচই খেলতে পারতাম। কিন্তু পিঠে ব্যথা থাকায় পারিনি। আমাদের কোচ সারওয়ার ইমরান স্যার অনেক সহজেই আমার ভয় দূর করেদেন। তিনি দারুণ একজন কোচ। তবে যেহেতু এমন আসরে প্রথম তাই কী করবো কী করবো ভেবে নার্ভাস ছিলাম বেশ।

প্রশ্ন: কত দিন নিজের গতি ঠিক ধরে রাখতে পারবেন বলে মনে করেন?

হোসেন আলী: আমার অস্ত্র গতি আর আউট সুইং। দুটিই ধরে রাখতে চাই। এ জন্য আমি প্রতিদিন ঘোড়াশাল থেকে নরসিংদী স্টেডিয়ামে যাই। সেখানে জিম করে দুপুরে মাঠে ঘুমিয়ে বিকালে রানিং করে বাসায় আসি। আর সুইমিং করার জন্য বাসার কাছে শীতলক্ষ্য নদীতে যাই চার দিন। নিজেকে ফিট রাখার জন্য সবই করি।

প্রশ্ন: বিপিএলে তো অনেক টাকা পেলেন, বাসার সবাই এখন কী বলে?

হোসেন আলী: টাকা পেলে আনন্দ পাই, কারণ এটা ভাবি যে টাকার অভাবে আমাকে ক্রিকেট খেলা ছাড়তে হবে না তাই। একটা সময় ছিল ঢাকায় খেলতে গেলে বা দূরে খেলতে গেলে টাকা পেতাম না বাসা থেকে। বিশেষ করে ঢাকা আসতে ৭৫ টাকা ভাড়া লাগতো। তখন টেপ টেনিসে খেপ খেলতাম, ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা যা পেতাম তা লুকিয়ে রাখতাম। সেটা দিয়ে ভাড়া চলতো আমার।

এরপর প্রথম যেদিন গাজী গ্রুপ আমাকে প্রিমিয়ারে খেলার জন্য ১ লাখ টাকা দিলো আমি একাডেমিতে টাকাটা নিয়ে চলে আসি। আমার হাত কাঁপছিল এক লাখ টাকা হাতে নিয়ে। টাকাটা অনেকক্ষণ বিছানায় রেখে তাকিয়ে ছিলাম। এত টাকা আমার হাতে! কী দেখে আমাকে দিলো? সেবার টাকা পেয়ে আব্বুর জন্য বাসায় মিলাদ পড়িয়েছি। আম্মুর জন্য শাড়ি কিনেছি। আর ভেবেছি যে খেলতে যেতে ভাড়ার জন্য আর কষ্ট করতে হবে না। এখনতো সবাই ক্রিকেট ছাড়তেই না করে।

প্রশ্ন: কোন পেসারকে আদর্শ মানেন?

হোসেন আলী: মাশরাফি ভাই ও শোয়েব আকতারকে। তবে মাশরাফি ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার সাহস পাই না। ছোটতো যদি কথা বলতে গেলে কিছু মনে করেন। আর এমন কোনো রাত নেই যে শোয়েব আকতারের বোলিংয়ের ভিডিও না দেখে আমি ঘুমাই।

প্রশ্ন: এক কথায় আপনার লক্ষ্য কি?

হোসেন আলী: ভালো ক্রিকেটারের সঙ্গে ভালো মানুষ হওয়া। সূত্র: দৈনিক মানবজমিন।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত

সর্বশেষ সংবাদ

June 2018
M T W T F S S
« May    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930