শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পে দূর্নীতি মৌলভীবাজারেই ৬০ লাখের বেশি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ



এম. মছব্বির আলী : একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পে অর্থ বিপুল পরিমাণ আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বরাদ্দের চেয়ে কম টাকায় গবাদিপশু, গৃহনির্মাণসামগ্রী ও কৃষি উপকরণ ঋণ দিয়ে রেজিস্ট্রারে বেশি উল্লেখ করে এসব টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজারেই ৬০ লাখ টাকার বেশি আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সদর উপজেলা পল্লী উন্নয়ন অফিসার ও হিসাব রক্ষক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে দুর্নীতির সঙ্গে ঋণবিতরণ কমিটির সভাপতির সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। সমবায় বিভাগ সূত্র জানায়, মৌলভীবাজার জেলার সাত উপজেলায় প্রতিটিতে চারটি করে ইউনিয়নে ২২০টি সমিতির মাধ্যমে ৪ হাজার ৮৩৬ সদস্যকে ৩ কোটি ৪ লাখ ৫ হাজার টাকা ঋণ দেয়া হয়। মৎস্য ও সবজি চাষ, পশুপালন, নার্সারি, বাঁশ-বেত কুঠিরশিল্প ইত্যাদির উপকরণ ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়। সদর উপজেলার চারটি ইউনিয়নে ৩১ সমিতির ৭৫৬ জন সদস্যের মধ্যে গাভী, ঢেউটিন ও মুরগি এবং নগদ অর্থঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়। এই উপজেলায় সর্বমোট ৪৮ লাখ ৫৪ হাজার টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়। একই প্রক্রিয়ায় জেলার অন্য ছয়টি উপজেলায় ঋণ বিতরণ করা হয়। সূত্র জানায়, সদর উপজেলায় শাজ উদ্দিনকে ১৬ হাজার ৫০০, সুন্দর মিয়াকে ১৭ হাজার, আবদুল খালিক ১৭ হাজার এবং হাবিউল্যাহকে ১৬ হাজার ৫০০ টাকায় গরু কিনে দেন উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা আবদুল হাই ও হিসাব রক্ষক শ্রীবাস দাস। এ সময় প্রতিটি গাভী ২০ হাজার টাকা দরে কেনা হয়েছে দেখিয়ে নির্ধারিত ফরমে স্বাক্ষর নেয়া হয়। পরে ঋণের কিস্তি আদায়ের সময় প্রতিটি গাভীর দাম ২০ হাজার টাকা দেখিয়ে ৪৫০ টাকা করে মাসিক কিস্তি পরিশোধ করতে বলা হয়। কিন্তু তারা কমদামে গাভী কিনে বেশি টাকায় ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের প্রতিমন্ত্রী, সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব বরাবর সুবিচার চেয়ে আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক তদন্তে শুধু গাভী কেনা বাবদ প্রায় ৬ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান। সূত্র জানায়, সদর উপজেলায় তিন জনকে গৃহনির্মাণ বাবদ ঢেউটিন কিনে দেয়া হয়। প্রতি বান্ডিল টিনের মূল্য সাড়ে ৭ হাজার টাকা করে কেনা হলেও সরকারি খাতায় ১০ হাজার টাকা করে উল্ল্যেখ করা হয়। প্রতি বান্ডিলে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা বেশি দেখানোর বিষয়ে ঋণ গ্রহীতারা অভিযোগ করেন।
প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, ঢেউটিন কেনা বাবদ প্রায় ৯ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। ঋণ বাবদ বিতরণ করা হাঁস-মুরগি কেনাকাটায়ও একই প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি করা হয়েছে। ১৬টি মুরগির বাচ্চার দাম ধরা হয়েছে গড়ে ৬ হাজার টাকা। বাস্তবে এর দাম হচ্ছে ২ হাজার টাকা। এই খাতে ঋণ গ্রহীতার কাছ থেকে অতিরিক্ত গড়ে ৪ হাজার টাকা বেশি খরচ দেখিয়ে নির্ধারিত ফরমে স্বাক্ষর রাখা হয়েছে। এই খাতেই ৭ উপজেলায় ঋণ বিতরণে প্রায় ৪২ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে। সূত্র জানায়, ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে সদর উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা আবদুল হাই ও হিসাবরক্ষক শ্রীবাস দাসের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের সুপারিশ করা হয়েছে। ঋণ বিতরণ কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ না করে বলা হয়েছে কমিটির সভাপতি হিসেবে ঋণ বিতরণে সংঘটিত দুর্নীতির দায় তিনি এড়াতে পারেন না। সেই ক্ষেত্রে বিষয়টি অধিকতর তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। সেই ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দিয়ে বিষয়টি তদন্ত করানো যেতে পারে। এ বিষয়ে সমবায় বিভাগের সচিব ড. মিহির কান্তি মজুমদার সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় জানান, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের ঋণ বিতরণে কিছু কিছু জেলা-উপজেলায় অনিয়ম হয়েছে। সরকার আন্তরিক বলেই এসব বিষয় তদন্ত হচ্ছে। মৌলভীবাজার জেলার ঘটনাটি তদন্ত হয়েছে। পুনঃতদন্ত হবে। যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাকেই শাস্তির আওতায় আনা হবে। তবে বিশাল এ প্রকল্পের কাজে প্রায় ১০ হাজার ব্যক্তি জড়িত। বিশাল এ কর্মকাণ্ড পরিচালনায় কে যে কি করছেন তা বুঝে উঠা সত্যিই মুশকিল হয়ে পড়েছে।