সোমবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

‘গণহত্যার’ আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করেছে বিএনপি



33968_BNP Flau up-1

ডেস্ক রিপোর্ট : ৫ মে রাতে মতিঝিলের শাপলা চত্বরের নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়ে সরকারের যৌথ বাহিনী যে ‘গণহত্যা’ চালিয়েছে, তার আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি।
দলের স্থায়ী কমিটির এক বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু স্বাক্ষরিত এ বিবৃতি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, “ঘুমন্ত ও ইবাদতরত মানুষগুলোকেই মধ্যরাতের পর বেপরোয়া গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ গণহত্যায় আইনশৃঙ্খলা ও আধা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সরকারি দলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরাও সরাসরি অংশ নিয়েছে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালো রাতে ঘুমন্ত মানুষের ওপর যে পৈশাচিক গণহত্যা এ অঞ্চলে পাকিস্তানের মৃত্যু ঘটিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে অনিবার্য করে তুলেছিল ৫ মে কালো রাতের গণহত্যা কেবল তার সঙ্গেই তুলনীয়। এ বর্বরতা ঔপনিবেশিক ভারতের কুখ্যাত ‘জালিয়ানওয়ালাবাগের’ হত্যাকান্ডকেও হার মানিয়েছে। মানবতার ইতিহাসে ক্ষমাহীন এ জঘন্য হত্যাযজ্ঞ কলঙ্কের এক নতুন অধ্যায় হয়ে থাকবে। এর জন্য আওয়ামী লীগকে কেবল ইতিহাসের কাঠগড়ায় নয়, আইনের কাঠগড়াও এক সময় দাঁড়াতে হবে।”
“আমরা এ গণহত্যার বিষয়ে নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্তের আহবান জানাচ্ছি। আমরা দল-মত নির্বিশেষে বাংলাদেশের জনগণকে প্রতিবাদ ও ন্যায়বিচার দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে সোচ্চার হওয়ার আহবান জানাচ্ছি।”
বিএনপির বিবৃতিতে বলা হয়, “এ হত্যাযজ্ঞ সম্পূর্ণভাবে ঠান্ডা মাথায় সুপরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে। আওয়ামী সশস্ত্র ক্যাডারদের পূর্ব থেকে মোতায়েন করা, তাদের পরিকল্পিত তান্ডব, হেফাজতের ওপর এর দোষ চাপানো, বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা, অভিযানের আগে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকদের ঘটনাস্থল থেকে বিতাড়িত করা থেকে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।”
হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে হটানোর পর সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি না দেয়ার সমালোচনা করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বলেছে, “পৈশাচিক ঘটনাবলী সম্পর্কে সরকারের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবরণ বা প্রেসনোট দেয়া হয়নি। হতাহতের কোনো সঠিক পরিসংখ্যানও দেশবাসীকে জানানো হয়নি। বিদেশি গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন সূত্রে আড়াই থেকে তিন হাজার লোককে হত্যা এবং ১০ হাজারের অধিক মানুষ আহত হওয়ার কথা জানা যাচ্ছে। বিভিন্ন আলোকচিত্র ও ভিডিও ফুটেজে অভিযানে বেপরোয়া গুলিবর্ষণ, অসংখ্য লাশের ছড়াছড়ি, মৃতদেহের ওপর দিয়ে ভারী যানবাহন চালিয়ে দেয়া এবং ট্রাকভর্তি লাশ সরিয়ে নেয়ার নৃশংস দৃশ্যাবলী দেখে দেশবাসীর সঙ্গে আমরাও শিউরে উঠেছি।”
“শেখ হাসিনার সরকার গত ৫ মে রবিবার মধ্যরাতের পর রাজধানী ঢাকার মতিঝিল শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী লাখ লাখ নিরস্ত্র জনসাধারণের ওপর ভয়াবহতম যে পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে তাতে দেশবাসী ও সচেতন বিশ্ববিবেকের সঙ্গে আমরাও স্তম্ভিত এবং গভীরভাবে বেদনাহত। নিজের দেশের মানুষের ওপর কোনো সভ্য সরকার এমন জঘন্য বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালাতে পারে, তা আমাদের কাছে কল্পনাতীত। এই নৃশংস মারণযজ্ঞের প্রতিবাদ জানাবার ও শোক প্রকাশের ভাষা আমাদের নেই।”
“আমরা জেনে স্তম্ভিত হয়েছি যে, মধ্যরাতের এ নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আধা-সামরিক বাহিনীকে রণসজ্জায় সজ্জিত করে অভিযানে নামানো হয়। আর্মড পারসোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি)সহ যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত ভয়ঙ্কর সব মারণাস্ত্র ও সাজসরঞ্জাম নিরস্ত্র জনগণের সমাবেশ ভাঙতে ব্যবহার করা হয়। অথচ দেশবাসী জানেন, বিডিআর বিদ্রোহের সময় পিলখানায় আটক সেনা কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের রক্ষার জন্য শতমুখী করুণ ফরিয়াদ সত্ত্বেও এই সরকার এ ধরনের কোনো অভিযান পরিচালনার অনুমতি দেয়নি।”
“দেশবাসী দেখেছে যে, রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে হেফাজতে ইসলাম লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ মানুষের অংশগ্রহণে বিভিন্ন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে আসছে। ৫ মেও তারা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি পালন শেষে শাপলা চত্বরে অনুমোদিত সমাবেশে যোগ দিতে আসে। হেফাজতের এ কর্মসূচি উপলক্ষে শাসক দল আওয়ামী লীগ আগের দিনেই তাদের দল ও অঙ্গ সংগঠনের লোকদের নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেয়ার নির্দেশ দেয়। ওই নির্দেশ অনুযায়ী আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং জিরো পয়েন্ট, জাতীয় প্রেসক্লাব, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের আশপাশে সরকারি দলের সশস্ত্র ক্যাডাররা সকাল থেকেই অবস্থান নিয়েছিল। এরাই হেফাজতের সমাবেশে যোগ দিতে আসা নিরস্ত্র কর্মী-সমর্থকদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে সশস্ত্র হামলা চালায়। উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তাদের হামলার চিত্র বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে।”
“আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরকারের নির্দেশে আক্রমণকারীদের সুরক্ষা দিয়ে হেফাজত কর্মীদের ওপরেই যৌথভাবে হামলা চালায়। তারা বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ করে। এতে অন্তত ৬ জন নিহত ও শতাধিক আহত হয়। এ ন্যক্কারজনক হামলার শিকার হেফাজত কর্মীরা শাপলা চত্বরের সমাবেশের দিকে চলে যাওয়ার পর সরকারি দলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা পল্টন মোড় ও বায়তুল মোকাররম এলাকা দখলে নিয়ে পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ছত্রছায়ায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, বাণিজ্য কেন্দ্র, ফুটপাতের বইয়ের দোকান ও যানবাহনে বেপরোয়া হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায়। তারা বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ এমনকি পবিত্র কোরআন শরিফেও অগ্নিসংযোগ করে। বিভিন্ন বেসরকারি টিভি চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচারিত ভিডিও ফুটেজে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের পদ-পদবীধারী বেশ কয়েকজনকে এসব সন্ত্রাসী তৎপরতায় নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে।”
“এরপর অপরাহ্নে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ এক সংবাদ সম্মেলনে সকল সন্ত্রাসী তৎপরতার জন্য হেফাজতে ইসলামকে দায়ী করেন। তিনি তাদের ‘রাজাকার-আলবদরের নতুন প্রজন্ম’ বলে উল্লেখ করে অবিলম্বে ঢাকা ছাড়ার নির্দেশ দেন। অন্যথায় হেফাজতে ইসলামকে গর্তে ঢুকিয়ে দেয়ার হুমকি দেন তিনি। সৈয়দ আশরাফ বলেন, হেফাজতকে দমন করতে আওয়ামী লীগই যথেষ্ট। ”
“শাসক দলের নেতার অস্ত্রের ভাষায় দেয়া এ হুমকি, শান্তিপূর্ণ মিছিলে হামলা করে হতাহত করার প্রতিবাদে এবং ১৩ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে হেফাজতে ইসলাম শাপলা চত্বরে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি শুরু করলে সরকার তাদের নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটায়। এ লক্ষ্যে সন্ধ্যা থেকেই পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে দলীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের আশপাশে জড়ো করা হয়।”
“মধ্যরাতের পর শাপলা চত্বর ও আশপাশে অবস্থানরত হেফাজতের নেতাকর্মীরা যখন ঘুমে এবং কেউ কেউ জিকির-আসকারে নিমগ্ন সেই সময় তাদের ওপর নেমে আসে পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ।”
“আমরা গভীর বেদনার সঙ্গে জানাতে চাই যে, এ হেফাজত কর্মীদের বেশির ভাগই গ্রামের দরিদ্র পরিবার থেকে আসা মাদ্রাসা ছাত্র। যাদের এক বিরাট অংশ এতিম। কিশোর ও বৃদ্ধরাও ছিলেন তাদের মধ্যে। সারাদিনের পথশ্রমে ক্লান্ত-শ্রান্ত এ মানুষগুলো ছিলেন ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া নগরীর এ মেহমান ও মুসাফিরদের খাদ্য ও পানীয় সরবরাহের জন্য ঢাকাবাসী ও দলীয় নেতাকর্মীদের আহবান জানালেও সরকারি দলের সন্ত্রাসী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেষ্টনীর মধ্যে তা সরবরাহ করতে তারা ব্যর্থ হন।”
“হত্যাযজ্ঞের পরপর সরকার বিনা নোটিশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অজ্ঞাত পরিচয় সশস্ত্র ব্যক্তিদের পাঠিয়ে জোর করে এবং ভাঙচুর চালিয়ে ইসলামিক টেলিভিশন ও দিগন্ত টিভির সমপ্রচার তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দিয়ে এমন আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে যা উপেক্ষা করে কোনো সংবাদ মাধ্যম হত্যাযজ্ঞের কোনো বিবরণ প্রকাশের সাহস পাচ্ছে না। একই রাতে বিশিষ্ট কলামিস্ট প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমানের বাসায়ও সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। এখন ত্রাস নিয়ন্ত্রিত দেশীয় গণমাধ্যমে কেবল সরকারি ভাষ্য ও পাবলিসিটি ম্যাটেরিয়াল প্রচারিত হচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, এর মাধ্যমে শতাব্দীর জঘন্যতম গণহত্যাকে আড়াল করা যাবে না।”
“গণহত্যার পরদিন যাতে কেউ এর প্রতিবাদ করতে না পারে তার জন্য সরকার রাজধানীজুড়ে সভা-সমাবেশের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা জারি করে তা থেকে এ সরকারের ফ্যাসিস্ট চরিত্র পরিষ্কার ফুটে উঠেছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।”
“হেফাজতে ইসলাম আলেম, মাদ্রাসা শিক্ষক ও ছাত্রদের সমন্বয়ে গঠিত একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। তাদের কিছু কিছু দাবির প্রতি আমাদের সমর্থন থাকলেও অনেক দাবির সঙ্গে আমাদের দ্বিমতও রয়েছে। আমাদের দেশের আলেম সমাজ হাজার বছর ধরেই বিভিন্ন ইসলামী জলসা, ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় সমাবেশে এ কথাগুলোই প্রচার করে আসছেন। ইসলাম, মহানবী (স.) এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বিরদ্ধে যেকোনো কুৎসা ও কটূক্তির জন্য শাস্তির দাবিতে তারা বরাবরই সোচ্চার থেকেছেন। এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়।”
“ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী বিএনপি একটি উদারনৈতিক অসামপ্রদায়িক আধুনিক রাষ্ট্র গঠনে প্রয়াসী। নর-নারীর সমতাভিত্তিক একটি কর্মমুখর সমাজ বিকাশের লক্ষ্যে বিএনপি কাজ করে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে আমরা বিশ্বাস করি, হেফাজতসহ যেকোনো সংগঠনের অধিকার রয়েছে শান্তিপূর্ণভাবে তাদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরতে সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করার। ফ্যাসিস্ট সরকার তাদের সেই অধিকার কেড়ে নিয়ে পাইকারি হত্যাকান্ড চালিয়েছে। বহু মানুষকে আহত করেছে। এ জঘন্য গণহত্যার পর এ দেশের শাসন ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার আওয়ামী লীগের নেই। ”