শনিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

নিখোঁজের ১৩ মাস আজ : মিলেনি ইলিয়াস আলীর সন্ধান : থামেনি পরিবারের চোখের জল



220px-M.Ilias_Ali

মোহাম্মদ আলী শিপন, বিশ্বনাথ : বিএনপি’র নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক, সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য এম.ইলিয়াস আলী এবং তাঁর গাড়ি চালক আনসার আলী নিখোঁজের তের মাস পূর্ণ হচ্ছে আজ ১৭ই মে শুক্রবার। নিখোঁজ হওয়ার এতদিন পেরিয়ে গেলেও তাদের কোন সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি। ইলিয়াস আলীর মত একজন প্রভাবশালী উদীয়মান তরুণ রাজনীতিবিদ নিখোঁজ হওয়ার পেছনের কারণ আজো জানা যায়নি। ইলিয়াস আলীকে ফিরে পেতে আর্তি জানিয়েছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা।
এদিকে, ইলিয়াস আলীর সন্ধান দাবিতে তাঁর জন্মস্থান বিশ্বনাথে স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগি সংগঠনের উদ্যোগে আজ শুক্রবার মিলাদ মাহফিল ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্টিত হবে। বাদ আসর উপজেলা সদরের মাদানিয়া মাদ্রাসা মসজিদে মিলাদ মাহফিল শেষে দলীয় কার্যালয়ের সামন থেকে মিছিল বের করা হবে বলে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গৌছ খান জানান।
যে ভাবে নিখোঁজ হন ঃ ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে নিজ বাসায় ফেরার পথে রাজধানী ঢাকার মহাখালী থেকে নিখোঁজ হন ইলিয়াস আলী ও তাঁর বিশ্বস্থ গাড়ি চালক আনসার আলী। মধ্যরাতে মহাখালী এলাকা থেকে ইলিয়াস আলীর গাড়িটি উদ্ধার করে পুলিশ। সেই সময় থেকেই তারা নিখোঁজ রয়েছেন।
আন্দোলনে উত্তাল দেশ ঃ প্রভাবশালী উদীয়মান তরুণ ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে রাজপথে নেমে আসেন দলের নেতাকর্মীসহ সর্বস্থরের জনতা। মিছিল, মিটিং, সভা, সমাবেশ, সড়ক অবরোধ, হরতাল, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করা হয় দলের পক্ষ থেকে। এসময় ইলিয়াসের সন্ধানের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠে সারা দেশ। এসব কর্মসূচীতে একে একে ৮টি তাজা প্রাণ হারিয়ে গেল। এখন ইলিয়াসের সন্ধান দাবিতে মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ ও দোয়ামাহফিল অব্যাহত রয়েছে।
নিখোঁজের কারণ জানা যায়নি ঃ ইলিয়াস আলীর মত একজন প্রভাবশালী উদীয়মান তরুণ রাজনীতিবিদ নিখোঁজ হওয়ার পেছনের কারণ আজো জানাতে পারেনি কেউ। সাধারণ মানুষের একটাই প্রশ্ন ইলিযাস আলী ও তাঁর গাড়ি চালক আনসার আলীর সন্ধান কি আর পাওয়া যাবে ? নাকি কি বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম, চট্টগ্রামের জামাল উদ্দিন ও যুবলীগ নেতা লিয়াকত হোসেনের মতো হারিয়েই যাবেন? এক ইস্যুতে অন্য ইস্যু চাপা পড়ার মতো ধীরে ধীরে অন্ধকারে হারিয়ে যাবে ইলিয়াস ইস্যুও। ইলিয়াসকে খুঁজে বের করতে কোন তৎপরতাও এখন আর মত লক্ষ করা যায় না। ইলিয়াসের বর্তমান অবস্থা জানতে চান বিশ্বনাথের মানুষ। ইলিয়াস আলীর মতো রাজনীতিবিদ এভাবে হারিয়ে যাবেন অথচ তার অনত্মর্ধানের রহস্য জানা যাবেনা এটা হতে পারে না। নিখোঁজের রহস্য উদঘাটন না হওয়ায় উদ্বেগ-উৎকন্ঠা আর অজানা আশস্কায় রয়েছেন তাঁর নিজ উপজেলা বিশ্বনাথের মানুষ। তারা বলেন, ইলিয়াস নিখোঁজসহ আলোচিত একাধিক ঘটনার কোন ক্লু বের করতে পারেনি পুলিশ। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর কি কারণে কারা ঘটিয়েছে? এসব খুঁজে বের করতে চরম ভাবে ব্যর্থ হয়েছে প্রশাসন। তারা মনে করেন, ইলিয়াস আলীর নিখোঁজের রহস্য উদঘাটন করে জনসম্মুখে উপস্থাপন করতে না পারাটা প্রশাসনের ব্যর্থতা।
ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঃ ইলিয়াস আলী নিখোঁজের সংবাদ তাঁর নিজ জন্মস্থান বিশ্বনাথ উপজেলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে রাজপথে নেমে আসেন উপজেলার দলের নেতাকর্মীসহ সর্বস্থরের মানুষ। তাদের দাবি জীবনত্ম ও অক্ষত অবস্থায় তারা তাদের প্রিয় মানুষ ইলিয়াস আলীকে ফিরে পেতে চান। তাইতো গত বছরের ২৩ শে এপ্রিল হরতালের দিন উপজেলা সদরের উপজেলা বিভিন্নস্থান থেকে দল বেঁধে মিছিল সহকারে উপজেলা সদরের দিকে আসতে থাকেন বিক্ষোব্ধ জনতা। এসময় মিছিলকারীদের পুলিশ বাঁধা দিলে ঘটে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা। স্বাধীনতার পর এই প্রথম বিশ্বনাথে এতবড় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নিখোঁজের ঘটনার পর সারা দেশে ৫দিন হরতাল পালন করা হয়। হরতালে সারা দেশের ন্যায় ইলিয়াস আলীর নিজ এলাকা বিশ্বনাথ ছিল উত্তাল। ২৩ এপ্রিল বিশ্বনাথে স্বরণকালের ভয়াবহ সংঘর্ষে গুলিতে নিহত হয় মনোয়ার, সেলিম ও জাকির নামের তিন যুবক। আহত হন আরোও অনেকই।
১১ হাজার মানুষকে আসামি করে মামলা ঃ গত বছরের ২২ ও ২৩ এপ্রিলের সংঘর্ষের ঘটনায় বিশ্বনাথে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের আসামী করে দায়ের করা হয় ৬টি মামলা। এসব মামলায় উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী ও অনেক সাধারণ মানুষসহ প্রায় ১১হাজার মানুষকে আসামী করা হয়। চার ইউপি চেয়ারম্যানসহ শতাধিক নেকাকর্মী কারাবরণ করেন। ইতিমধ্যে ছয়টি মামলার মধ্যে চারটি মামলার তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র থানা পুলিশ আদালতে দাখিল করে। এতে বিএনপি-জামায়াতের কয়েক শত নেতাকর্মীকে অভিযুক্ত করা হয়।
থামেনি পরিবারের চোখের জল ঃ গত বছরের ১৭ এপ্রিল ঢাকার বনানী থেকে নিখোঁজ হবার পর ইলিয়াস আলীর পরিবারের ভর করে দীর্ঘশ্বাসের কালোমেঘ। এখনো থামেনি পরিবারের চোখের জল। সনত্মান হারা বৃদ্ধা মাকে সান্তনা দিতে প্রায় প্রতিদিন গ্রামের বাড়িতে দলের নেতাকর্মীরা ছুটে আসলেও এখন আর আগের মত ইলিয়াস আলীর গ্রামের বাড়িতে নেতাকর্মীদের নেই তেমন কোন আনাগোনা। সনত্মানকে হারিয়ে নির্বাক ইলিয়াস আলীর গর্ভধারিনী বৃদ্ধা মা সূর্যবান বিবি। তিনি পুত্র শোকে কাতর। অনেকটা শয্যাশায়ী অবস্থায় তিনি অপেক্ষার প্রহর গুণছেন পুত্রের জন্য। তিনি এখন প্রতিদিন নামাজ পড়ে ছেলেকে ফিরিয়ে পাওয়ার জন্য দোয়া করে আসছেন।
বিশ্বনাথবাসীর মধ্যে বিরাজ করছে হতাশা ঃ নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও তাদের কোন সন্ধান না পাওয়ায় ইলিয়াস আলীর নিজ জন্মভূমি বিশ্বনাথ উপজেলাবাসীর মধ্যে বিরাজ করছে হতাশা। কিনত্ম শেষ হচ্ছে না অপেক্ষার প্রহর। কবে শেষ হবে এই অপেক্ষার পালাক, কবে ফুঁটবে ইলিয়াস আলী ও আনসার আলীর পরিবারের মুখে হাসি এই ঘুরপাক খাচ্ছে সর্বত্র। তবুও নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর অপেক্ষায় অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছেন তার পরিবার, নিজ দলের নেতাকর্মীরা ও বিশ্বনাথের সর্বস্থরের মানুষ। বিশ্বনাথবাসীর প্রশ্ন ইলিয়াস ও তার গাড়ি চালক আনসার কি আদৌ উদ্ধার হবেন?
প্রতিফলন ঘটেনি সেই মানবতার ঃ ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর তার খুঁজে পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে জানানো হয়েছিলো আকুতি। তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী সনত্মানদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন ‘স্বজন হারানোর বেদনা আমিও বুঝি’। এসময় প্রধানমন্ত্রী রাজনীতির উর্ধ্বে মানবতা উলেখ করে ইলিয়াস আলীকে খুঁজে বের করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিনত্ম এখনো প্রতিফলন ঘটেনি সেই মানবতার। সেই মানবতার দিকেই তাকিয়ে আছেন ইলিয়াসের পরিবার।
পরিবারের আর্তি ঃ স্বামীর খোঁজে দিশেহারা ইলিয়াসের স্ত্রী তাহসিনা রুশদি লুনা। পিতাকে ফিরে পাবার আশায় বুকে পাথর বেঁধে দিন যাপন করছে ইলিয়াসের পুত্র আবরার ইলিয়াস, লাবিব সারার ও মেয়ে সাইয়ারা নাওয়াল। পরিবারের একটাই দাবি তারা যে কোন মূল্যে ইলিয়াস আলী ও তাঁর গাড়ী চালক আনছার আলীকে অক্ষত এবং সুস্থ অবস্থায় তাদের মাঝে ফিরে পেতে চান। ইলিয়াস আলীর ছোট ভাই এম.আসকির আলী বলেন, ইলিয়াস আলী মাটি ও মানুষের নেতা। তিনি কোন দিন কারো ক্ষতি করেননি। তিনি সব সময় মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্ঠা করেছেন। এই মানুষটিকে কেন গুম করা হলো ? এর উত্তর জনগণ জানতে চায়। আমরা ক্ষমতা প্রতিপত্তি কিছু চাই না। যে কোন মূল্যে ইলিয়াস আলী ও তার গাড়ী চালক আনসার আলীকে অক্ষত এবং সুস্থ অবস্থায় আমাদের মাঝে ফিরে পেতে চাই। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, উনার প্রশাসন যন্ত্র, দেশের সকল রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং দেশের সকল বিবেকবান মানুষের কাছে আমার পরিবারের পক্ষ থেকে আকুল আবেদন, উনাদের ঐকানিত্মক ও আনত্মরিক প্রচেষ্টায় ইলিয়াস আলী এবং তার গাড়ী চালক আনসার আলীকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন। আমরা দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই।