রবিবার, ১৪ অগাস্ট ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বুড়িকিয়ারি বাঁধ অপসারণ না করায় কুলাউড়াসহ ৭ উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ আতঙ্কে



এম. মছব্বির আলী : ফেঞ্চুগঞ্জের একটি অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখাসহ ৭ উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের ৫২টি গ্রামের কৃষক ও হাকালুকি হাওর এলাকার মানুষের জীবনে নেমে এসেছে অভিশাপ। গুটি কয়েক বিত্তশালীর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে হাজার হাজার কৃষক ও ভাটি এলাকার মানুষের জীবনকে চরম দুর্ভোগের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। গত বছর এই বাঁধের কারণে দীর্ঘ ৬ মাস ৭ উপজেলাবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে স্কুলের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। দীর্ঘ জলাবদ্ধতায় সৃষ্ট বন্যায় স্কুলে পানি ওঠায় হাকালুকি হাওর এলাকার ভূকশিমইল, জায়ফরনগর ও কুলাউড়া পৌরসভা এবং ৭ উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের ভাটি এলাকার প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ ও মাদ্রাসা কয়েক মাস ছিল বন্ধ। শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ে শিক্ষাদীক্ষায়। কৃষকরা আউশ-আমন চাষাবাদ করতে পারেননি। যারা করেছিলেন, তার সবকিছু জলাবদ্ধতা ধ্বংস করে ফেলে। কিন্তু এত দুর্ভোগের পরও দীর্ঘ এক যুগেও সেই অপরিকল্পিত বুড়িকিয়ারি বাঁধ অপসারণ করা হয়নি। ফলে চলতি বছর বর্ষা আসতেই এবং বর্তমানে লাগাতার ভারী বর্ষণে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে ৭ উপজেলার কৃষকসহ কয়েক লাখ মানুষের মধ্যে। হাওর এলাকার বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকার ছত্রিশ ও পিটাইটিকর গ্রামের মানুষের সুবিধার্থে ৮০০ মিটার দীর্ঘ বুড়িকিয়ারি বাঁধের নির্মাণকাজ শুরু করা হয় ২০০১ সালে। পৌনে ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ওই বাঁধের নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০০৭ সালে। বুড়িকিয়ারি বাঁধের শুরু থেকেই হাকালুকি হাওর এলাকার লোকজন নানা আপত্তি ও বাধা দিয়ে এলেও কর্তৃপক্ষ মানুষের বাধা উপেক্ষা করে বাঁধটি নির্মাণ করে। ফলে হাওরের পানি নিষ্কাশন একেবারে বন্ধ হয়ে পড়ে। বর্ষা মৌসুমে লাগাতার বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হাকালুকি হাওর মারাত্মক জলাবদ্ধতায় পড়ে। নানামুখী সমস্যায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন হাওর এলাকার সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার ৭টি উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ। শত শত মানুষের বাড়িতে ওঠে পানি। কোথাও কোমরপানি আবার কোথাও হাঁটুপানি। চলাচলে সৃষ্টি হয় চরম দুর্ভোগ। জলাবদ্ধতায় সৃষ্ট বন্যায় বাড়ির পাশে পানিতে ডুবে গত বছর ১১ শিশুর মৃত্যু হয় বলে হাওর বাঁচাও কৃষক বাঁচাও আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সূত্রে আরও জানা যায়, জলাবদ্ধতার কারণে ৭ উপজেলার অনেক এলাকার লোকজন একেবারে গৃহবন্দী হয়ে পড়েন। তখন হাওরপারের ৭ ইউনিয়নের হাজার হাজার লোক বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা হাকালুকি হাওরের সব বাজার, ইউনিয়ন এলাকা, ৭ উপজেলা সদর, জেলা সদরে এবং বিভাগীয় সদরে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও সভা সমাবেশ এবং ডিসি অফিস ঘেরাওসহ নানা কর্মসূচি পালন করে। হাওর বাঁচাও কৃষক বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ৭ উপজেলাসহ বিভাগব্যাপী। টনক নড়ে সরকারের সংশিষ্ট মন্ত্রণালয়ের। পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ সেন সরেজমিনে বুড়িকিয়ারি বাঁধ পরিদর্শন করে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছিলেন, বুড়িকিয়ারি বাঁধ অপসারণে তিনি শিগগিরই ব্যবস্থা নেবেন। সেই মোতাবেক কাজও এগিয়ে গিয়েছিল; কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় বুড়িকিয়ারি বাঁধ আজও অপসারণ করা হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হাওর এলাকার ভুক্তভোগীরা। এ ব্যাপারে হাওর বাঁচাও কৃষক বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এইচ এম আলাউদ্দিন বলেন, ফেঞ্চুগঞ্জের বুড়িকিয়ারি ক্রসবাঁধ অপসারণ না হওয়ায় জলাবদ্ধতার কারণে কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখাসহ ৭ উপজেলার হাজার হাজার মানুষের বাড়িঘর ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষকদের চোখে-মুখে এখন আতঙ্কের চাপ। গত বছরের মতো এবারও তাদের কষ্টের ফসল জলাবদ্ধতায় নষ্ট হয়ে যাবে কি না, এ চিন্তায় অনেকের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। তিনি অবিলম্বে বুড়িকিয়ারি বাঁধ অপসারণের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান। এ ব্যাপারে হাওর বাঁচাও কৃষক বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ভূকশিমইল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সিরাজ উদ্দিন বাদশাহ বলেন, বুড়িকিয়ারি বাঁধ অপসারণ না করায় গত বছরের মতো এবারও মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার ৭টি উপজেলার ৫২টি গ্রামের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ২০১০ সালে এ অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে সৃষ্ট বন্যায় কৃষকদের ১৩ লাখ হেক্টর জমির ধানক্ষেত বিনষ্ট হয়েছিল। মানুষের জানমালেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। তাই এই বুড়িকিয়ারি বাঁধ অপসারণ না হলে এ অঞ্চলের মানুষের খাদ্য ঘাটতি পূরণ হবে না এবং দুর্ভোগ লাঘব হবে না। অবিলম্বে তিনি এই অপরিকল্পিত বুড়িকিয়ারি বাঁধ অপসারণ করে হাকালুকি হাওরবাসীকে রক্ষার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।