রবিবার, ২ অক্টোবর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৭ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ল্যাংটার ওরস, কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি



16

নিউজ ডেস্ক :: মতলব উত্তর বদরপুর (বেলতলী) গ্রামে শাহ সুফি সোলেমান ল্যাংটার মাজারে বৃহস্পতিবার (৩১ মার্চ) থেকে ৭ দিনব্যাপী ৯৭তম ওরস ও মেলা শুরু হয়েছে। ৭ দিনের এ মেলা আগে ও পরে এক মাস স্থায়ী থাকে। আর এ উপলক্ষে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয় এখানে।

মিলাদের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এ মেলার উদ্বোধন করা হয়। এবার মেলার নিরাপত্তায় নেয়া হয়েছে ডিজিটাল ব্যবস্থা। মাজার প্রাঙ্গণসহ মেলার বিভিন্ন স্থানে বসানো হয়েছে শতাধিক সিসি ক্যামেরা।

এর আগে মেলার আয়োজন নিয়ে আয়োজক কমিটির মধ্যে চরম দ্বন্দ্ব নিরসন করে স্থানীয় প্রশাসন। কমিটির সভাপতি এস এম রশিদ সরকার ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আহমেদ মোল্লা মেলা আয়োজনে পৃথক-পৃথকভাবে প্রশাসনের কাছে আবেদন করেন। চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ল্যাংটার মাজার শরীফের কমিটি নেতাদের বিরোধ ও অস্থিরতা প্রায় ৩ বছর ধরে বিরাজ করছে। ফলে ৯৭তম বার্ষিক ওরশ অনুষ্ঠান নিয়ে সবাই শঙ্কিত ছিল।

জানা গেছে, এখানে ওরশ চলাকালে কোটি-কোটি টাকার চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি হয়। কমিটিতে যারা থাকেন তারাই বিশেষ করে এ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ক্ষমতা না থাকলে চাঁদাবাজি ও মাজারের টাকা লুটপাট করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই কমিটি নিয়ে তিন বছর যাবৎ কয়েকটি পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে।

সোলেমান ল্যাংটা উপমহাদেশের একজন খ্যাতিমান আউলিয়ার দাবিদার। বাংলা ১২৩০ সালে কুমিল্লা জেলার মেঘনা উপজেলার গোবিনাদপুর ইউনিয়নের আলীপুর গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারে শাহ সুফি সোলেমান ল্যাংটা জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আলা বক্স ভূঁইয়া। তার জীবনের অধিকাংশ সময়ই কাটিয়েছেন মতলবের বিভিন্ন অঞ্চলে। সোলেমান ল্যাংটা কখনো পোশাক পরিধান করতেন না। তাই তার মাজারটি ল্যাংটার মাজার হিসেবেই পরিচিত।

ল্যাংটা ১৮ বছর বয়সে প্রেম করে বিয়ে করেন। নারায়ণগঞ্জের বক্তাবলির রাধানগরে এক নারীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এখন সেখানে তার আওলাদরা আছে বলে দাবি উঠেছে এবং তারা প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট সময় ওরসের ডাক দিচ্ছে।

শাহ সুফি সোলেমান ল্যাংটার ফকিরি লাভ সম্পর্কে জানা যায়, ইমাম উদ্দিন মিয়ারা ছিল তিন ভাই। তিন ভাই নৌকায় করে ভাদ্র মাসের এক অমাবস্যা রাতে সোনারগাঁয়ে তাদের পীরের সাথে দেখা করতে যাচ্ছিলেন। নৌকার মাঝি ছিলেন সোলেমান শাহ। পথিমধ্যে বৃষ্টি হয়, তিন ভাই ছিল নৌকার ভেতর। সোলেমান শাহ ভিজে ভিজে নৌকা চালায় এবং গন্তব্যে হাজির হয়ে যায়।

নির্দিষ্ট সময় পীর আসে এবং এ দৃশ্য দেখে রাগ হয়। পীর তখন তিন ভাইকে উলঙ্গ হয়ে আসতে বলে। তিন ভাই চিন্তায় পড়ে যায়। আপন মায়ের পেটের তিন ভাই কীভাবে উলঙ্গ হবে একে অপরের সামনে। পীর সাহেব মাঝি সোলেমানকে কাছে আসতে বলেন। সোলেমান কাছে যায়। পীর তাকে হা করতে বলেন এবং মুখে ফুঁক দেন। সেখান থেকেই সোলেমান ল্যাংটা হয়ে বাড়ি ফিরে।

সোলেমান ল্যাংটার অনেক অলৌকিক ঘটনা রয়েছে। তার মধ্যে সোলেমান ল্যাংটা কালিপুর রমিজ উদ্দিন প্রধানীয়ার বাড়িতে যান। সেখানে দেখেন নারীরা নদী থেকে ঘটে করে পানি এনে ঘর, উঠান লেপছে। তিনি তাদের পানি আনার কষ্ট দেখে তাদের চোখ বন্ধ করতে বলেন। তারা চোখ বন্ধ করলে ল্যাংটা তার নফস টেনে প্রায় ২/৩ হাত লম্বা করে পুরো উঠান পানিতে ভিজিয়ে দেন। এ ঘটনা তিনি বিভিন্ন গ্রামে করেছেন।

এক সময় মানুষ হজে যেত জাহাজে কিংবা পায়ে হেঁটে। এতে অনেক দিন লাগতো। হজে যাওয়ার সময় অনেকেই ল্যাংটাকে বদরপুর দেখে গেছে। অথচ হজ পালন করার সময় অনেকেই তাকে কাবা শরীফে দেখেছেন নামাজ আদায় করতে। এমন অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা লোকমুখে প্রচারিত।

সোলেমান ল্যাংটার বোনের বাড়ি বদরপুরে মাজার অবস্থিত। ১৩২৫ বাংলা সনের ১৭ চৈত্র শাহ সুফি সোলেমান ল্যাংটা তার বোনের বাড়ি বদরপুর গ্রামে মৃত্যুবরণ করলে সেখানে কবর দিয়ে মাজার স্থাপন করা হয়। প্রতি বছর চৈত্র মাসের ১৭ তারিখে তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ৭ দিনব্যাপী ওরস অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে এবং মেলা বসে। ওরস শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে ও পর পর্যন্ত মেলা স্থায়ী হয়।

এছাড়া প্রতিবছর ভাদ্র মাসে ও প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার মাজারে ভক্তদের আগমন ঘটে। চৈত্র মাসের ১৭ তারিখের মেলায় দেশের বিভিন্ন স্থানসহ পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ ভক্ত, আশেকান ও সাধারণ জনগণ আসা যাওয়া করেন। ওরসকে কেন্দ্র করে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে মেলায় বসে রকমারি দোকান ও বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ভক্তদের আস্তানা। মেলায় চলে বিভিন্ন প্রকার পণ্যের ক্রয়- বিক্রয়। কেউ কেউ মাদক ও অশ্লীলতার মাঝে নিজেকে ডুবিয়ে রাখে।

৭ দিনের এই মেলায় আসা প্রত্যেক দোকান থেকে ২ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়। মাজারে মানত মানতে দেয়া হচ্ছে গরু, ছাগল, নগদ অর্থ, আগরবাতি ও মোমবাতি। প্রতিদিন এখান থেকে উঠছে কোটি টাকা। সব মিলে এখানে বাণিজ্য হচ্ছে কয়েক কোটি টাকা। এ টাকার কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না সরকার। অনেকেই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে। সারা বছর এ মাজারটি অর্থ পাওয়ার সেক্টরে পরিণত হয়েছে। টাকা ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষ ও মামলা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতি বছরের মতো এখানে মেলা শুরুর আগেই চলছে মাদক বিক্রি, সেবন ও অশ্লীলতা। মেলার শুরুর আগেই নেশাখোররা মাজারের চারপাশে প্রায় ৫ শতাধিক আস্তানা গেরে বসে। জানা যায়, সব প্রকার মাদকদ্রব্যই পাওয়া যায় এ মেলায়। নেশাখোরদের দেখলেই মনে হয় মেলা প্রাঙ্গণ যেন নেশার স্বর্গরাজ্য। দলে দলে আস্তানা গেঁড়ে সেবন করছে মাদকদ্রব্য।

মেলা প্রাঙ্গণের বাতাসে বইছে গাঁজার গন্ধ। ল্যাংটার মেলাকে গঞ্জিকাসেবীদের মেলা হিসেবে অনেকেই মন্তব্য করেছেন। পুলিশ এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে গেলেও মনে হয়েছে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তারা নিরুৎসাহিত।

মতলব উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর হোসেন মজুমদার বলেন, ‘আগে কী হয়েছে তা নিয়ে ভাবার সময় নেই। এখনকার বিষয় হচ্ছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। ইতোমধ্যে মেলা প্রাঙ্গণে শতাধিক সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

উদ্বোধনের পর চাঁদপুরের পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার মেলা পরিদর্শন করেন। তিনি সেখানে মাদক সেবন ও অশ্লীলতা রোধে কাজ করতে মেলার আয়োজকদের নির্দেশ দেন। নাহলে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের কথা জানান তিনি। পুলিশ সুপারকে মেলার কর্মকর্তারা তাদের ঐতিহ্য লাল রঙের গামছা দিয়ে বরণ করে নেয়।