শুক্রবার, ৭ অক্টোবর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২২ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

মানুষ বাঁচে তার কর্মের মধ্যে বয়সের মধ্যে নয়, প্রয়াত আব্দুন নুর মাস্টার তেমনি একজন।



মিজান আনসারী:সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই পৃথিবীতে মানুষের আগমন ও প্রস্থান একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। প্রকৃতির এই নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ পৃথিবীতে মানুষের ক্ষনিক সময়ের অবস্থানকে কেউ করেছেন তার কর্ম, ব্যক্তিত্ব, আদর্শ ও মহত্ত্ব দিয়ে চিরস্মরনীয় আবার কারো আসা যাওয়াই হয়েছে শুধুমাত্র পৃথিবীতে কিছু সময় কাটানোর নামান্তর। আজ যাকে নিয়ে আমার এই ক্ষুদ্র প্র‍য়াস তিনি একজন মানুষ গড়ার কারিগর, আদর্শ পিতা, সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্নদ্রষ্টা, রাজনীতিবীদ, গ্রাম্য শালিসি বিচারের প্রানপুরুষ ও সর্বোপরি যার ব্যক্তিত্ব ও কর্ম দিয়ে জয় করেছেন সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। তিনি আর কেউ নন, তিনি আমাদের সকলের শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব আমার পিতৃতুল্য আব্দুর নুর মাস্টার চাচা।

ছোটবেলা থেকে উনার সাথে আমার পরিচয়। আমাদের পরিবারের সাথে এত সম্পৃক্ত ছিলেন যে, আমাদের পারিবারিক বিভিন্ন বিষয়ে চাচার সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। আমার বাবা উনাকে বড় ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করতেন এবং আমার বাবাকে ছোট ভাইয়ের মতো সারাজীবন স্নেহ করেছেন। বাবার মৃত্যুর পরও উনি আমাদের সবসময় খোজখবর নিতেন।

যাইহোক, একজন ব্যক্তি কিভাবে পরিবার, সমাজ কিংবা সমগ্র উপজেলায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয়েছেন যে বিষয় একটু আলোকপাত করার চেষ্টা করবো। উনার প্রথম যে পরিচয় সেটি উনি একজন শিক্ষক, একজন মানুষ গড়ার কারিগর, তবে এই পেশাতে থাকা অবস্থায় তিনি সমাজের নানা অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্বোচ্ছার ছিলেন যা তাকে কখনোই একটি সরকারি চাকুরী বা নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে আটকে রাখতে পারেনি। তীক্ষ্ণ ও সুক্ষ্ম বিচার করার ক্ষমতা উনার আরেকটি বড় পরিচয় ছিলো,
যার জন্য তিনি ব্যাপকভাবে সমাদৃত ছিলেন। অনেক জটিল বিষয় নিজ উপজেলা কমলগঞ্জ বাইরেও তিনি সমাধান করে প্রশংসা পেয়েছেন, যেখানে অনেকক্ষেত্রে ধরাসায়ী হয়েছেন জনপ্রতিনিধিরা কিংবা অনেক অভিজ্ঞরা। উনার অবর্তমানে আজ অনেকেই গ্রাম্য শালিশে উনার অনুপস্থিতি ব্যাপকভাবে অনুধাবন করতে পারছেন।

পারিবারিক জীবনে তিনি এক আদর্শ পিতা যিনি তার পুত্র কন্যাকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে সফল ও প্রতিষ্ঠিত মানুষ করে গেছেন। বিশেষ করে উনার পরিবারের সদস্যরা মানুষের কল্যাণে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন। শিক্ষাবিস্তারে উনার দান অপরিসীম। অত্র অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের কথা বিবেচনা করে পারিবারিক অর্থায়নে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় গড়ে তুলেছেন আব্দুর নুর নুরজাহান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়। এমনকি অত্র বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বেতন মওকুফ ও ইউনিফর্ম এর ব্যবস্থা করেছেন উনার পারিবারিক অর্থায়নে। বিদ্যালয়টি অত্র অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারে নিরলস ভুমিকা পালন করে যাচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের রাস্তাঘাট নির্মানে উনি অবিরাম কাজ করে গেছেন। বিশেষ করে কমলগঞ্জ শ্রীমঙ্গলের মাটি ও মানুষের নেতা বর্ষিয়ান পার্লামেন্টারিয়ান উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ মহোদয়ের মাধ্যমে এই এলাকার রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন যা আমাদের চিন্তাকেও হার মানায়। মসজিদ ও মাদ্রাসার উন্নয়নে তিনি কাজ করেছেন অবিরাম। তিনি রুপশপুর দাখিল মাদ্রাসা কমিটির উপদেষ্টা ছিলেন এবং মাদ্রাসার উন্নয়নে উনার সম্পৃক্ততা ও আন্তরিকতার ফলস্রুতিতে উনার মৃত্যুর কয়েকদিন পর মাদ্রাসা কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উনার যোগ্য উত্তরসূরী লন্ডন প্রবাসী বিশিষ্ট কমিউনিটি নেতা শ্রদ্ধেয় নজরুল ইসলামকে উনার স্থলাভিষিক্ত করেছেন।

আব্দুর নুর মাস্টার চাচা স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তিনি আজীবন ওতোপ্রোতো জড়িত ছিলেন।বিশেষ করে আলহাজ্ব উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহিদ মহোদয়ের হাতকে শক্তিশালী করতে ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায়ে তিনি কাজ করে গেছেন। সমাজসেবামূলক কাজের অংশ হিসাবে উনার পারিবারিক ট্রাস্টের কথা উল্লেখ করতে হয়। উনার পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা উনি আব্দুর নুর– নুরজাহান চৌধুরী কল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করে সমাজের অবহেলিত মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। বিশেষ করে গরীব ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের আর্থিক সহযোগিতা ও মেধাবৃত্তির ব্যবস্থা করে সমাজে শিক্ষার আলো ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন।

উনার কর্মজীবনকে আসলে স্বল্প পরিসরে লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরা সম্ভব নয়। তবে উনার জীবন ও মানব কল্যানে উনার অপরীসিম অবদান আমাদের জন্য শিক্ষা হয়ে থাকবে জীবনভর। অত্র এলাকার মানুষ উনাকে স্বরন করবে উনার বহুমুখী কর্ম ও অদর্শের দিক বিবেচনা করে। পরিশেষে আল্লাহর কাছে এই চাওয়া আল্লাহ যেনো মানুষের কল্যাণে উনার কাজগুলোকে কবুল করে জান্নাতের উচ্চ আসন দান করেন, আমীন।****************************************************

মিজান আনসারী
বি এ অনার্স, এম এ (ইংরেজি সাহিত্য)
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়