সোমবার, ১৫ অগাস্ট ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

গ্রামবাংলার মজুর-কিষাণ হও আগুয়ান।




মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

কথায় বলে ‘নেংটির নিচে কাপড় নাই, ভর্তার নিচে তরকারি নাই’। তেমনিভাবে বলা যায় যে, আমাদের দেশে ‘ক্ষেতমজুরের নিচে মানুষ নাই’। এ দেশের কামলা-কিষান-মজুরদেরকে সমাজে ‘ছোট জাতে’র মানুষ বলে গণ্য করা হয়। প্রধানত এঁদের পরিশ্রমের ফলেই দেশের মানুষ খেয়ে-পরে বাঁচতে পারছে। একাত্তরে যাঁরা অস্ত্র হাতে নিয়ে জীবন বাজি রেখে দেশকে হানাদার বাহিনীর হাত থেকে মুক্ত করেছিল, তাঁদের ৭৫ ভাগই ছিল ‘ছোট জাতে’র বলে গণ্য এসব খেটেখাওয়া মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের অর্জনের জন্য সিংহভাগ কৃতিত্ব তাঁদেরই। অথচ প্রায় ৫০ বছর পরেও ‘ক্ষেমজুরের নিচে মানুষ নেই’-এই দশা তাঁদের দূর হয়নি। গরিব ও প্রান্তিক কৃষকরা ক্রমাগত নিঃস্বকরণের প্রক্রিয়ায় তাঁদের শেষ সম্বল ‘দুই বিঘা জমি’ হারিয়ে আজ ভ‚মিহীন হয়েছে। কৃষক থেকে ক্ষেতমজুরে রূপান্তরের বিষয়টি তাঁদের কাছে ‘জাত খুইয়ে’ ‘ছোট লোকে’ পরিণত হওয়ার মতোই বেদনার বিষয়। একজন নিতান্ত গরিব কৃষকের মনেও এই মর্মে একটাও সম্মানবোধ থাকে যে, অর্ধভুক্ত হয়ে জীবন কাটাতে হলেও সে নিজের জমিতে কাজ করে খায়। তাঁদেরকে অন্যের ‘গোলামি’ করে চলতে হয় না। ক্ষেতমজুররা আসলেই এক ধরনের ‘গোলাম’।
মজুরি-দাসত্বের শিকল তাঁদেরকে শোষণ, বঞ্চনা, অমর্যাদার সবচেয়ে নিচের সিঁড়িতে আটকে ফেলেছে।

অথচ মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশ্রæতি ছিল যে, তাঁরাই হবে দেশের প্রকৃত ‘মালিক’। সংবিধানে সে কথাই লেখা আছে। গণতন্ত্রের পথে দেশ চলছে বলে দাবি করা হয়। গণতন্ত্রের অর্থ হলো সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন। সে কথা যদি সত্যি হতো তাহলে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সব স্তরের শাসনকাজেই ক্ষেতমজুরদের কর্তৃত্ব থাকত। রাষ্ট্রের কাজকর্ম প্রধানত তাঁদের স্বার্থে পরিচালিত হতো, কিন্তু দেশে তার উল্টোটাই ঘটে চলেছে।

ক্ষেতমজুররাই হলো দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। অথচ ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তাঁদের কোনো সংগঠন ছিল না। ডাক্তার, উকিল, ব্যারিস্টার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক, শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র এমনকি দেশের কোটিপতি ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, ডিসি সাহেব, সচিব সাহেবদেরও সমিতি-সংগঠন-ট্রেড ইউনিয়ন থাকলেও কেবল ক্ষেতমজুরদের ছিল না কোনো স্বতন্ত্র সংগঠন-সমিতি। ১৯৮১ সালের ১৮ মার্চ ‘বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি’ নামে জাতীয় ভিত্তিতে প্রথম তাঁদের সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বছর খানেকেরও বেশি সময় ধরে সারা দেশে শত শত গ্রামে বৈঠক, সভা করে ক্ষেতমজুরদের
কথা-পরামর্শ গ্রহণ করা হয়। তাঁদেরকে নিয়ে গড়ে তোলা বা স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে গড়ে ওঠা সংগ্রামের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে ঢাকায় সহস্রাধিক ক্ষেতমজুর প্রতিনিধির উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ক্ষেতমজুর সমিতি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল।

বিদ্যুৎ-বেগে ছড়িয়ে পড়েছিল ক্ষেতমজুরদের আন্দোলন ও সংগঠন। অল্প দিনেই ৫ হাজার গ্রামে সমিতির শাখা গঠিত হয়েছিল। ক্ষেতমজুর সমিতির সদস্য সংখ্যা দ্রæতই ৫ লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। প্রজেক্টের গম চুরির বিরুদ্ধে, খাস জমির দাবিতে, সারা বছর কাজ ও ন্যায্য মজুরির দাবিতে আন্দোলন দুর্বার হয়ে উঠেছিল। এরই এক পর্যায়ে ঢাকা অভিমুখে ক্ষেতমজুরদের একটি লং-মার্চের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল। ’৮২ সালে এরশাদের সামরিক শাসন জারী করে সংগ্রামের সেই অগ্রযাত্রা বন্ধ করার চেষ্টা হয়েছিল। বিবিসি’র ভাষ্যকার সেদিন বলেছিলেন ‘সামরিক আইন জারীর ফলে তাৎক্ষণিকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে তুমুল বেগবান হতে থাকা ক্ষেমতজুর সমিতির কাজ’। কিন্তু সামরিক আইনের মধ্যেও নানা পন্থায় ক্ষেতমজুরদের সংগ্রাম বেগবান করার কৌশল নেয়া হয়েছিল। ক্ষেতমজুররা তাঁদের নিজস্ব দাবিগুলোর সঙ্গে স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামে নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়েছিল। আন্দোলনকে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে তাঁরাই অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করেছিল। শহিদ হয়েছিলেন ক্ষেতমজুর নেতা লখাই হওলাদার, আমিনুল হুদা টিটো, জয়নাল, সোনা মিয়া প্রমুখ। ‘গম চোর নিপাত যাক’ সেøাগানের সাথে স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে যুক্ত হয়েছিল ‘ভোট চোর-ঘুষখোর নিপাত যাক’ সেøাগানও।

১৯৮০ সাল থেকে একটানা ১২/১৪ বছর আমি ক্ষেতমজুর আন্দোলন-সংগঠনের কাজে সরাসরি যুক্ত থেকেছি। সে সময়গুলোতে ঘুরে বেড়িয়েছি কত না গ্রামে! ঢাকা থেকে বের হয়ে একটানা ২/১ সপ্তাহ গ্রাম-গ্রামান্তর চষে বেড়াতাম। ‘লিকের’ (চওড়া আইল) রাস্তা দিয়ে সাইকেল বা মটর বাইক চালিয়ে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যাতায়াত করা, সন্ধ্যার পর ‘খুলি বৈঠক’ (উঠান বৈঠক) শেষে মধ্য রাতে গ্রামেরই কোনো বাসায় ফিরে এসে রাত কাটানো, সন্ধ্যার পর গ্রামের স্কুল-মাঠে মাইক লাগিয়ে কিচ্ছা-কাহিনিসহ লম্বা বক্তৃতা করা, ঘেরাও-ধর্ণা আয়োজন করা, লাল নিশান পুঁতে দিয়ে খাস জমিতে দখল প্রতিষ্ঠা করা-এসবই ছিল নিত্য কর্মকাণ্ড।

ক্ষেতমজুর সমিতির কাজ করার সময়টিই ছিল আমার রাজনীতির পাঠ নেয়ার শ্রেষ্ঠ সময়। শ্রেণি সংগ্রামের বাস্তব কর্মকাণ্ডই যে মার্কসবাদ অধ্যয়নের শ্রেষ্ঠ পাঠশালা, আমি তার প্রমাণ পেয়েছিলাম।

সে সময়ের অনেক স্মৃৃতি আজও আমাকে প্রেরণা দেয়। একবার একটি গ্রামে সন্ধ্যা শেষের বৈঠকে ক্ষেতমজুরদের প্রধান দাবি কী হওয়া উচিত-এই প্রসঙ্গে একজন ক্ষেতমজুর উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন যে, ‘আমাদের প্রধান দাবি হওয়া উচিত আমরা যেন ক্ষেতমজুর হতে পারি’। প্রথমে তাঁর কথার অর্থ না বুঝলেও একটু পরেই উপলব্ধি করেছিলাম যে-তিনি বলতে চাইছেন যে, ক্ষেতমজুররা যেন বছরের ৩৬৫ দিনই ‘ক্ষেতমজুর’ হয়ে থাকতে পারে, অর্থাৎ সারা বছর যাতে তাঁদের কাজ থাকে, সেটাই হওয়া উচিত তাঁদের প্রধান দাবি। ‘বাড়ি যাওয়ার আগে আরেকটু কাজ করে যা’ কিংবা ‘আরও হাত লাগিয়ে ঝটপট করে কাজ কর’ ইত্যাদি উপায়ে কীভাবে জোতদাররা ক্ষেতমজুরদের থেকে বাড়তি শ্রম আদায় করে নেয়, তা থেকে সরাসরি আয়ত্ত করেছিলাম ‘প্রত্যক্ষ উদ্বৃত্ত মূল্য’ ও ‘আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত মূল্যের’ মার্কসীয় তত্ত¡ ইত্যাদি কত ঘটনা।

এখনো মনে পড়ে, ঢাকায় অনুষ্ঠিত সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম সভায় দেয়া একজনের বক্তৃতার কথা। তিনি বক্তৃতা শুরু করেছিলেন এ কথা বলে যে, “আমার গ্রামের জোতদার যখন ঢাকায় আসেন তখন তার ছেলে তাকে জিজ্ঞেস করে ‘বাবা তুমি ঢাকা থেকে আমাদের জন্য কী আনবে?’ আর আমি গতকাল রওনা হওয়ার সময় আমার ছেলে আমার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে শুধু প্রশ্ন করল, ‘বাবা তুমি যে ঢাকায় যাচ্ছ, কিন্তু আমাদের জন্য কী রেখে গেলে?’ দুই বাবার কাছে তাঁদের দুই ছেলেকে এ যে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী পৃথক দুই রকম প্রশ্ন! এটা কী ধরনের সমাজ? এই সমাজ ভাঙতেই হবে।”

গ্রাম-গ্রামান্তরে ঘুরতে ঘুরতে একবার কোনো একটি গ্রাম-বৈঠকে হাজির হয়ে কথাবার্তার শুরুতেই ‘আপনাদের গ্রামের নাম কী?’-প্রশ্ন করায় একজন জবাব দিয়েছিল, ‘গ্রামের নাম গণ্ডগ্রাম’। যে গ্রাম একেবারে দুর্গম এবং যেখানে অন্য কোনো জায়গার মানুষের তেমন যাতায়াত নেই বললেই চলে, এমন গ্রামকে ‘গণ্ডগ্রাম’ বলা হয়ে থাকে। গ্রামের নাম শুনে আমি তাই আনন্দে চমকে উঠেছিলাম। যাক! তৃণমূলে গ্রামে-গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে আজ শেষ পর্যন্ত ‘গণ্ডগ্রামে’ এসে হাজির হয়েছি।

বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে এ কথার প্রমাণ পেয়েছিলাম যে, খেটে খাওয়া মানুষের মুক্তির বার্তা যদি একেবারে গণ্ডগ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া যায়, তাহলে মুক্তির সংগ্রামের বিজয় কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। গণ্ডগ্রামের জাগরণ একদিন ‘বড় খবর’ হয়েই দেশবাসী ও বিশ্ববাসীকে চমকে দিতে সক্ষম হবে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে খেটেখাওয়া মানুষরা সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় অস্ত্র হাতে লড়াই করায়, বিজয় এসেছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র ক্ষমতার ওপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় সেদিনের সে বিজয় আজ হাতছাড়া হয়ে গেছে। শোষণমুক্তি ঘটেনি। দেশ আজ ১ শতাংশ দেশি-বিদেশি লুটেরাদের দখলে চলে গেছে। তাদেরকে সেখান থেকে সরিয়ে শোষিত-বঞ্চিত ৯৯ শতাংশ মানুষের দখল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাহলে কেবল অর্জিত বিজয় ধরে রাখা যাবে।

মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের নব অধ্যায়ে দেশের খেটে খাওয়া মানুষকে নেতৃত্বের দায়িত্ব নিতে হবে। গ্রাম-গ্রামান্তরে জেগে উঠতে হবে ক্ষেতমজুরদেরকে।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি ও সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)