বৃহস্পতিবার, ১ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বাদশা ভাই আমাদের জনপদের এক বিশ্বস্ত স্বজন।



রাজন আহমদ

আজকাল তো পাইকারি হারে মাটি ও মানুষের নেতা বলে অনেক জনকেই সম্বোধন করা হয় কিন্তু সত্যিকার অর্থেই মাটি ও মানুষের নেতা বলতে যা বুঝায়, তা কি যে কারো একটি সম্বোধনেই হয়ে যাবে? নিজের চোখেই দেখেছি ১০- ১৫ বছর আগে যে লোক অন্যের হাতের দিকে চেয়ে থাকতো, আজ সে নিজেই কোটি টাকার মালিক! আসলে আমাদের সমাজে জোঁকের মতো মানুষের রক্ত চুষা লোকজন যেমন আছে তেমনি মানুষের জন্য জীবন- যৌবন বিলিয়ে দেওয়া মানুষও আছে। সংখ্যায় কম হলেও শেষোক্ত মানুষের জন্যই এখনো সমাজটা টিকে আছে।
যাদের জীবনের প্রতিটি ধাপ সংগ্রাম এবং ত্যাগের। যারা দিতে জানে, বিনিময়ে কিছু নিতে জানে না, প্রকৃত অর্থে তাঁরাই মানুষ, তাঁরাই মাটি ও মানুষের নেতা। যাদের সংস্পর্শে গেলে মানুষের জন্য কাজ করার স্পৃহা জাগ্রত হয়। সে রকম একজন মানুষই ছিলেন হাওর বাঁচাও, কৃষক বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি, গণতন্ত্রী পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম সিরাজ উদ্দিন আহমেদ বাদশা ভাই। বাদশা ভাই বর্ণাঢ্য এক রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী ছিলেন। বক্তব্য দিতেন খুবই মেপে মেপে। জানাশোনার পরিধিটাও ছিল খুবই সমৃদ্ধ।
মৌলভীবাজার জেলার হাওরগুলো হাওর উন্নয়ন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত ছিল না, হাওর রক্ষা সংগ্রাম কমিটির নেতাদের জোর দাবির কারণেই পরে আমাদের জেলার হাওরগুলোকে সেই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আজ থেকে ১০ বছর আগে বাদশা ভাই’ই প্রথম মনু নদী খননের কথাটি একটি বক্তব্যে বলেছিলেন। মৌলভীবাজার ছাড়াও দেশের হাওর ও কৃষকের স্বার্থে বাদশা ভাই যা করে গেছেন, তা ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিশেষত, মৌলভীবাজারের কৃষি- কৃষক, হাওর ও নদী- নালা রক্ষায় বাদশা ভাইয়ের অবদান কিংবদন্তিতুল্য।
আমি সৌভাগ্যবান, বাদশা ভাইয়ের মতো এতো বড় একজন মানুষের সহচার্য লাভ করেছি। একাত্তরের রণাঙ্গনের বিজয়ী বীর, যার রয়েছে ষাট বছেরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, তাও আবার রাজপথের রাজনীতি। সুবিধাবাদীতার রাজনীতি যাকে স্পর্শ করতে পারেনি। জেল- জুলুমসহ নানান চড়াই-উৎরাই ছিল, ছিল আবার ক্ষমতার হাতছানি। কিন্তু আদর্শকে বিসর্জন দিয়ে কোন কালে অন্যায়- অবিচারের সাথে আপোষ করেননি। বাদশা ভাইয়ের হৃদয়টা ছিল অনেক বড়। আমার মতো অনুজের সাথেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। এই তো কিছু দিন আগেই ফোন দিয়ে বাসায় যাওয়ার জন্য বলেছিলেন। কিন্তু ব্যস্ততায় আর যাওয়া হয়নি। বাদশা ভাইয়ের মৃত্যুর পর থেকে এ বিষয়টি আমাকে খুব পীড়া দিচ্ছে!
আজীবন সংগ্রামী বাদশা ভাইয়ের সাথে পরিচয় প্রায় এক দশক আগে। বাদশা ভাইয়ের বয়স তখনই সত্তর পেরিয়ে গেলেও মনের দিক থেকে তরুণই ছিলেন। হাওর রক্ষা সংগ্রাম কমিটির ব্যানারে আমরা ভিন্ন ভিন্ন পথ এবং মতের মানুষ এক হয়েছিলাম।
মরহুম এডভোকেট গজনফর আলী মামা, গোলাম মুহিত মধু এবং মাও. মতিউর রহমান ভাই কয়েক বছর আগেই চলে গেছেন আর এবার চলে গেলেন বাদশা ভাই। যে বয়সে মানুষ নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে ঘরে বসে থাকে, ঠিক সে বয়সেই গজনফর আলী চৌধুরী এবং সিরাজ উদ্দিন বাদশা ভাই রাজপথের আন্দোলন – সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কাউয়াদিঘী হাওরের কৃত্রিম জলাবদ্ধতায় যখন হাওর পাড়ের হাজার হাজার মানুষ প্রতিবছর ভুগছিল। তখন গজনফর আলী এবং বাদশাহ ভাইরা রাজপথের আন্দোলনে আবারও গর্জে ওঠেছিলেন। হাওর রক্ষা সংগ্রাম কমিটির বিভিন্ন কর্মসূচি সফল করতে রায়পুর, জগৎপুর, অন্তেহরি, মীরপুর, পালপুর, চানপুর, কাশেমপুর পাম্প হাউজসহ বিভিন্ন জায়গায় চষে বেড়িয়ে মানুষকে সংগঠিত করেছিলেন।
মরহুম এডভোকেট গজনফর আলী এবং বাদশা ভাইয়ের হাতে সবসময় ছাতা থাকত। কী অদ্ভুত! তাঁদের হাতের ছাতার মতো আমাদের সকল কর্মসূচিতে এই দুজন মহান নেতা নিজেরাই আপাদমস্তক ছাতা হয়ে গিয়েছিলেন। ঝড়- তুফান যাই এসেছে মাথা উঁচু রেখেই তাঁরা তা মুকাবিলা করেছিলেন।
পিছিয়ে পড়া মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের অগ্রসেনানী মরহুম গজনফর আলী চৌধুরী এবং সিরাজ উদ্দিন বাদশাহ ভাই সাথে মধু ভাই এবং মতিউর ভাইসহ আরো যারা অন্ধকার কবরে চলে গেছেন, তাঁদের সকলের তরে বিনম্র শ্রদ্ধা। মহান আল্লাহ যেন তাঁদেরকে ক্ষমা করেন… আমিন।

সাধারণ সম্পাদক
হাওর রক্ষা সংগ্রাম কমিটি
মৌলভীবাজার সদর