শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

আইয়ুববিরোধী আন্দোলন এবং কিশোরী শেখ হাসিনা গল্প*।



আইয়ুববিরোধী আন্দোলন শুরু হলো। এই আন্দোলনে আমরাও শরিক হলাম। স্কুল থেকে বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় মিটিং শুনতে যেতাম। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধর্মঘট হলে আমাদের স্কুলে যাতে ধর্মঘট হয় সেই ব্যবস্থা নিতাম। একবার সকলে মিলে ঠিক করলাম ছুটির ঘণ্টা বাজিয়ে স্কুল বন্ধ করে দেবো। আমি তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। নবম ও দশম শ্রেণির ছাত্রীরা মিলে পরামর্শ করলাম একদল গেটে থাকবে, আর একদল ঘণ্টা বাজাবে। ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে গেট খুলে দেবে। যেই কথা সেই কাজ আমরা কয়েকজন ঘণ্টা বাজালাম। অন্য দল গেট খুলে দিলো। পাশেই ছোটোদের প্রথম শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত ক্লাশ ঘর। ছুটির ঘণ্টা
বাজার সঙ্গে সঙ্গে ক্লাস ছেড়ে বই খাতা নিয়ে দে ছুট। গেট দিয়ে বের হতে শুরু ক আমরাও ছুটতে ছুটতে বের হলাম। কারণ হেড স্যার রুম থেকে বের হয়েছেন, তা দেখে আমরাও দে ছুট, একদল গেটের বাইরে। অধিকাংশ মেয়েই বের হয়ে গেছে। শিক্ষকরা ছোটাছুটি শুরু করলেন। প্রথমে ক্লাসে শিক্ষকরাও বুঝতে পারেননি বিষয়টি কী? তাই তারাও বের হয়ে এসেছেন। পরে যখন বুঝতে পারলেন তখন আর সময় নাই। আমরা রাস্তায় মিছিল নিয়ে বের হলাম। বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও আপারা এসেছিলেন। পলাশীর মোড় হয়ে আমরা বটতলায় মিটিংয়ে শরিক হলাম।

এরপর আরও একদিন ধর্মঘট। ঐ দিন আমরা ঠিক করলাম স্কুল শুরু হবার আগেই গেটে পিকেটিং করব। কয়েকটা মেয়েসহ হাত ধরে গেটের সামনে দাঁড়ালাম। এর মধ্যে পুলিশের গাড়ি এলো। একজন অফিসার এসে আমাদের খুব ধমকাতে শুরু করল। আমরা তখনও গেটে দাঁড়ানো আমার নাম জিজ্ঞেস করল। এর একটু আগেই হেডমাস্টার সাহেব আমাদের নাম লিখে নেবার জন্য একজন শিক্ষককে পাঠিয়েছিলেন। তিনি লিখে নিয়ে গেছেন। সেই পুলিশের কর্মকর্তাকে বললাম, হেড স্যার লিখে নিয়ে গেছেন আপনি ওনার কাছ থেকে জেনে নিন। তিনি আমাকে গ্রেপ্তার করার হুমকি দিলেন। আমি তাকে বললাম, প্রায় প্রতি সপ্তাহে অথবা কখনও মাসে দুবার জেলগেটে যাই, কাজেই আমাকে জেলের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আমার আব্বা জেলেই আছেন ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিউটি আপারা এসেছিলেন। তারা একটু দূরে গাছ তলায় দাঁড়িয়েছিলেন। আমাকে ইশারা করলেন গেট ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে। কয়েকটি মেয়ে নিয়ে তার সঙ্গে মিছিল করে রওয়ানা হলাম বটতলার উদ্দেশে। পুলিশের গাড়ি আমাদের ধাওয়া করল। আমরা ইডেন কলেজের পাশ দিয়ে পলাশীর মোড় হয়ে হেঁটে ফুলার রোড হয়ে রোকেয়া হলে গেলাম। সেখানে মশা আপার সাথে কথা হলো, সেখান থেকে বটতলার মিটিং শেষে যখন ফিরছি পুলিশের গাড়ি ধাওয়া করলে আমরা তখন ছুটে ব্রিটিশ কাউন্সিলে ঢুকলাম। একটা পিপে ও মুড়ির টিনের মতো একটা বাস তখন বারবার ঐ এলাকায় চক্কর দিচ্ছিল। গাড়িগুলো সরে যেতেই ব্রিটিশ কাউন্সিলের পাশের রাস্তা দিয়ে জহুরুল হক হলের (তখন ইকবাল হল) ভিতর দিয়ে নীলক্ষেতের রাস্তায় এলাম। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম গাড়ি দেখা যায় কি না। এর মধ্যে রেলক্রসিং পড়ল, পুলিশের গাড়িগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে আটকা পড়ল। আমি তখন অন্য মেয়েদের নিয়ে হেঁটে রেলক্রসিং পার হয়ে রাস্তার ওপারে এলাম। একটা স্কুটার নিয়ে বাসার দিকে রওয়ানা হলাম। অন্য মেয়েরাও যার যার বাসায় চলে গেল। সেদিনের স্মৃতি আজ খুব স্পষ্ট হয়ে মনে পড়ে।

বাড়িতে এসে মা’কে সব ঘটনা বললাম। আমার মা’কে সব না বললে পেটের ভাত হজম হতো না। মা সব শুনলেন। সাবধানও করে দিলেন, তারপরও আমার মা’কে সব কথা বলতেই হবে।

শুধু ভয় হচ্ছিল হেড স্যার বকা দেবেন। পরদিন যখন স্কুলে এলাম খুব ভয় ছিল। তবে উপরের ক্লাসের চেরী, শিরীন, ফরিদা, মিঠু আপারাসহ আরও অনেকে ছিলেন, সবার নাম আজ আর মনে নেই। তারা উঁচু ক্লাসে, কাজেই দোষ তো তাদেরই বেশি। তবে আমরা তো কোনো অন্যায় করিনি। আমরা একটা আদর্শের জন্য লড়ছি।

#SheikhHasina #শেখহাসিনা #FansOfSheikhHasina