বুধবার, ১৭ অগাস্ট ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২ ভাদ্র ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ৩০ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ‘জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে সরকার ও নাগরিক সমাজের করণীয়’শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত।



,,মকিস মনসুর,
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ১৯ জানুয়ারি
সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে এক ভার্চুয়াল আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংগঠনের সভাপতি লেখক সাংবাদিক প্রামাণ্যচিত্রনির্মাতা শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে আলোচ্য বিষয় ছিল: ‘জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে সরকার ও নাগরিক সমাজের করণীয়’। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি।

সম্মেলনে বক্তব্য প্রদান করেন ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউটের সাম্মানিক সভাপতি নাট্যজন মুক্তিযোদ্ধা রামেন্দু মজুমদার, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ড. ফওজিয়া মোসলেম, নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, গ্রাম থিয়েটারের সভাপতি চলচ্চিত্রনির্মাতা নাট্যব্যক্তিত্ব মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ, প্রজন্ম ’৭১-র সভাপতি শহীদসন্তান আসিফ মুনীর তন্ময়, সর্ব ইউরোপীয় নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক যুক্তরাজ্যের মানবাধিকারকর্মী আনসার আহমদ উল্লাহ, নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট লীনা পারভিন, নির্মূল কমিটির নিউইয়র্ক শাখার সাধারণ সম্পাদক মানবাধিকারকর্মী স্বীকৃতি বড়ুয়া, টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফোরাম ফর হিউম্যানিটি, তুরস্ক-এর সাধারণ সম্পাদক লেখক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা শাকিল রেজা ইফতি, নির্মূল কমিটির বহুভাষিক সাময়িকী ‘জাগরণ’-এর হিন্দি বিভাগের সম্পাদক ভারতের সমাজকর্মী তাপস দাস, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল এবং বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা শাখার নেতৃবৃন্দ।

সভাপতির প্রারম্ভিক বক্তব্যে লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি জঙ্গি মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ ও জাতিগঠনের অঙ্গীকার নিয়ে আমাদের আন্দোলন যাত্রা শুরু করেছিল আজ থেকে ৩০ বছর আগে। দীর্ঘ তিন দশকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আরম্ভের মাধ্যমে আন্দোলনের প্রাথমিক বিজয় অর্জিত হলেও বাংলাদেশ থেকে আমরা মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল করতে পারিনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর সহযোদ্ধারা বাংলাদেশের মূল সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের প্রত্যয় ঘোষণার মাধ্যমে যে দিক নির্দেশনা প্রদান করেছিলেন, ৩০ লক্ষ শহীদ যে স্বপ্ন দেখেছিলেনÑ সেখান থেকে আমরা বহু দূরে সরে গিয়েছি। রাজনীতি, প্রশাসন, সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষাÑ সর্বত্র মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটেছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, বর্তমান বিশ্বে যেভাবে দক্ষিণপন্থার উত্থান ঘটছেÑ ধর্মনিরপেক্ষ মানবতা ও উদারনৈতিকতার জমিন সর্বত্র ক্রমশঃ সংকুচিত হচ্ছে।’

শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, ‘উপমহাদেশের দেশসমূহে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার উত্থান কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এক দেশে এর বিস্তার ঘটলে অন্য দেশেও তার অভিঘাত ঘটে। যে কারণে আমরা দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিক আন্দোলনসমূহের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছি। ’৭১-এর গণহত্যার স্বীকৃতি অর্জনের পাশাপাশি ধর্ম ও জাতিসত্তার নামে বিভিন্ন দেশে চলমান গণহত্যা, গৃহযুদ্ধ ও ছায়াযুদ্ধের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত যেভাবে গঠন করতে চাইছি একইভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যারা ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ার জন্য সংগ্রাম করছেন তাদের সম্মিলনেরও বহুমাত্রিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। জঙ্গি মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস নির্মূলনে সরকার ও নাগরিক সমাজকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। এই মানবতাবিরোধী অপশক্তিকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে মোকাবেলা করার পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে পরাভূত করার জন্য সরকারকে বিভিন্ন নাগরিক উদ্যোগে সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। সম্মিলিতভাবে কার্যকর ব্যবস্থাপত্র ও কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে হবে, যার দিক নির্দেশনা রয়েছে আমাদের ’৭২-এর সংবিধানে। ধর্মের নামে রাজনীতি থাকলে, ধর্মের নামে বৈষম্য, হত্যা ও সন্ত্রাস কখনও বন্ধ করা যাবে না। ’৭২-এর সংবিধানের মূল চেতনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন ও সংগ্রাম করতে হবে।’

সম্মেলনে প্রধান অতিথির ভাষণে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি নির্মূল কমিটির ৩০ বছর পূর্তিতে আন্দোলনের নেতাকর্মীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘নির্মূল কমিটির আন্দোলনের শুরু থেকেই চোখে আঙ্গুল দিয়ে অনেক কিছু আমাদেরকে দেখিয়ে যাচ্ছেÑ সেজন্য নির্মূল কমিটিকে ধন্যবাদ জানাই। আমরা জঙ্গিবাদের বিষদাঁতগুলো ভেঙে দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছি। কিন্তু সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পারিনি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী আমাকে বলেছেনÑ জঙ্গিবাদ নির্মূলে তোমরা রোল মডেল তৈরি করেছ।

‘জঙ্গিবাদ নির্মূলে আমরা আমাদের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে পেয়েছিলাম। শিক্ষক, ছাত্রসমাজ ও জনতা সবাই জঙ্গিবাদ নির্মূলে আমাদের সহযোগিতা করেছিল। গত ৩০ বছরে নির্মূল কমিটি যে কাজ করেছে জঙ্গিবাদ দমনে তা আমাদের পাথেয় হয়ে আছে। নির্মূল কমিটি মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করেছে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সবাইকে ঘুরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। এতে সবাই সাড়া দিয়েছে। এমনকি মা তাঁর ছেলেকে আমাদের কাছে ধরিয়ে দিয়েছেন, এরকম ৮টি ঘটনা ঘটেছে। জঙ্গিরা নিহত হলে তাদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজন লাশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। কোন ধর্মেই সন্ত্রাসবাদ ও মানুষ হত্যার অনুমতি দেয় না। বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সহযোগিতা আমাদেরকে জঙ্গিবাদ নির্মূলে সফলতা এনে দিয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে নির্মূল কমিটি জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার ঘটনাগুলো জনগণের সামনে নিয়ে আসে, যা সরকারকে সহযোগিতা করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য। আমরা জঙ্গিবাদ সম্পূর্ণ নির্মূল করতে না পারলেও তাদের বিষদাঁত ভেঙ্গে দিয়েছি।’

জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা নির্মূলনে সরকার ও নাগরিক সমাজের করণীয় নিয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ড. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক দেশ গঠনের জন্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে এ দেশকে স্বাধীন করেছিল। বঙ্গবন্ধু বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করেন বাহাত্তরের সংবিধানের মাধ্যমে। কিন্তু মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক একাত্তরের পরাজিত শক্তিরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে এদেশে পুনরায় সাম্প্রদায়কতার অপরাজনীতি আরম্ভ করে। মৌলবাদীরা রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার অনুপ্রবেশ ঘটানো থেকে শুরু করে শিক্ষা মাধ্যমেও ব্যাপকভাবে সাম্প্রদায়িকীকরণ করে যার ফলে দেশে ব্যাপকভাবে জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটে। ’৭৫-এর পর বাংলাদেশে হাজার হাজার কওমি মাদ্রাসা চালু হয়। বর্তমানে যার সংখ্যা প্রায় ৪৪ হাজার। মৌলবাদীরা নারীদের স্বাধীনতার উপরে হস্তক্ষেপ করে তারা নানাভাবে ধর্মীয় অপব্যাখ্যা দিয়ে নারীদের স্বাধীনতা খর্ব করে। আমাদেরকে এদের বিস্তার যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করতে হবে।’

সম্মেলনের শুভেচ্ছা বক্তব্যে ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউটের সাম্মানিক সভাপতি নাট্যজন মুক্তিযোদ্ধা রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘ধর্মের নামে রাজনীতি বন্ধ না করা গেলে বাংলাদেশ কিছুতেই সামনের দিকে এগোতে পারবে না। মুক্তিযুদ্ধ ও ’৭২-এর সংবিধানের মাধ্যমে আমরা যে চেতনাকে নিয়ে এগিয়েছিলাম তা যদি অব্যাহত থাকত তবে বাংলাদেশ এতদিনে সারা বিশ্বের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থিত হতো। দেশ থেকে জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদের দুষ্টচক্র রুখতে হলে সরকারকে যেমন অগ্রনী ভূমিকা পালন করতে হবে তেমনি আমাদের নাগরিক সমাজকেও একত্রিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে বর্তমানে যে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা চলছে তা প্রতিরোধে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকেও একজোট হয়ে কাজ করতে হবে যেন রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার উন্মেষ না ঘটে। সর্বপরি সাম্প্রদায়িক উত্থানকে রুখতে আমাদের দেশীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিচর্চা আরও বৃদ্ধি করতে হবে।’

নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির কাছে নির্লজ্জ পরাজয়ের জন্য পাকিস্তানের কোন লজ্জা বা অনুশোচনা হয়নি বরং ওরা আরও বেশি বর্বরতা ও হিংস্রতার আশ্রয় নিয়েছে। জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর ক্ষমতায় বসিয়েছিল ওদের ভাবশিষ্য জিয়াউর রহমানকে। তিনি ক্ষমতায় বসেই জেলে আটক সব যুদ্ধাপরাধী, দালাল, রাজাকার, আলবদরদের মুক্ত করে তাদের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেন। এই ধারাবাহিকতা চলতে থাকে দীর্ঘ সময়। তারা স্থাপন করে অসংখ্য স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় মাদ্রাসা, মসজিদ, ব্যাংক, বীমা ও সংখ্যাতীত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তাদের আদর্শে বাংলাদেশ হয় মিনি পাকিস্তান। সর্বাংশে ভূলুষ্ঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, সবকিছুই হারিয়ে যায়। বহুদিন পর ফিনিক্স পাখির মতো বাঙালি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশ আবার জেগে উঠেছে। কিন্তু পঁচাত্তরের পর পাকিস্তানের রোপিত চক্রান্তের বিষবৃক্ষ বিস্তার করে সমগ্র বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠান সব সংগঠন এমনভাবে কলুষিত করে ফেলেছে যে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনকালেও দেখি খেলার মাঠে ওড়ে পাকিস্তানের পতাকা, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে অন্য সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ভাঙচুর করা হয়, জ্বালিয়ে দেয়া হয়। হিন্দুদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়, জমিজমা ঘরবাড়ি বেদখল দিয়ে তাদের দেশ ছাড়া করা হয়। পাকিস্তানের দেয়া অস্ত্র দিয়ে বাংলাদেশের নব্য রাজাকাররা সন্ত্রাস চালায়। এমনকি পাঠ্যবই ছাপানোর সময়ও প্রেসে ঢুকে শেষ মুহূর্তে ওরা বিষয় বদলে দেয়। সাম্প্রদায়িক ভাবধারায় কবিতা ও রচনা ঢোকায়। এসব সংশোধন করার আর সময় থাকে না। সময়মত বই যেন না দেয়া যায় সে জন্য বাধা সৃষ্টি করে। পাকিস্তানি স্বাধীনতাবিরোধীরা রোহিঙ্গাদের দিয়ে বাংলাদেশে নানা ধরনের অপকর্ম করে চেষ্টা চালাচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে পাকিস্তানের এই চক্রান্ত প্রকাশ করে ওদের মুখোশ উন্মোচন করা উচিত। দেশবিরোধী, স্বাধীনতাবিরোধীদের নাগরিকত্ব হরণ করা এখন সময়ে দাবী।’

গ্রাম থিয়েটারের সভাপতি চলচ্চিত্রনির্মাতা নাট্যব্যক্তিত্ব মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশ নয় পৃথিবীর কোন দেশেই ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র মত একটি সামাজিক ও মানবধিকার আন্দোলন খুঁজে পাওয়া যাবে না। গণহত্যা ও জেনোসাইডের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচার ও শাস্তির দাবীতে গত তিন দশক ধরে সংগঠনটি যে লাগাতার কর্মসূচি ও আন্দোলন পরিচালনা করে আসছে, তা এককথায় অভূতপূর্ব। শুধু আন্দোলন নয় দাবী আদায়ে সফলও হয়েছে এ সংগঠনটি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার জন্য দায়ী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এদেশীয় অনুসারি রাজাকার আলবদরের বিচার প্রক্রিয়া শুরু ও দোষীদের মৃত্যদণ্ডসহ নানা মেয়াদের শাস্তি বিধানে এ সংগঠনটি নেতৃত্বের প্রশ্নে একক কৃতিত্বের দাবীদার। ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী ময়দানে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণআদালত অনুষ্ঠিত করে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তা ১৯৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশে নবজাগরণ সৃষ্টি করে।’

নাসির উদ্দিন ইউসুফ আরও বলেন, ‘লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি এবং গণ আদালতের মূল কারিগর। সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল কাজী নূরুজ্জামান ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে নিয়ে ১৯৯১ সালে শাহরিয়ার কবির প্রথম ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠনে তৎপর হন এবং প্রস্তুতিকালের প্রথম সভায় জাহানারা ইমাম সংযুক্ত হন এ সংগঠন প্রতিষ্ঠায়। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৯২-এর ১৯ জানুয়ারি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি আত্মপ্রকাশ করে। সব সময় শাহরিয়ার কবির সংগঠনের বিকাশ ও কর্মসূচি প্রণয়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন।’

প্রজন্ম ’৭১-র সভাপতি শহীদসন্তান আসিফ মুনীর তন্ময় বলেন, ‘দেশে ও প্রবাসে সাম্প্রদায়িক শক্তি চক্র অনেক সংগঠিত। তাদের সাংগঠনিক ও প্রচারণার মাধ্যমসমূহও এখন প্রযুক্তি নির্ভর। কাজেই জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা মোকাবেলা করতে সরকার, নাগরিক সমাজ ও অ্যাকটিভিস্টদের সুসংগঠিত ও প্রযুক্তি নির্ভর পাল্টা ন্যারেটিভ প্রচারণা ও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদদের আদর্শের একটি বড় দীক্ষা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ও সমুন্নত রাখা। যুগে যুগে এই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের দীক্ষাকে শিক্ষায় পরিণত করে তরুণ সমাজকে চরমপন্থি, সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গি ধ্যান-ধারণা থেকে সরিয়ে আনতে হবে।’

নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট লীনা পারভিন বলেন, ‘আমার সৌভাগ্য যে আজকে আমি নির্মূল কমিটির সাথে অফিশিয়ালি যুক্ত আছি। নির্মূল কমিটি আমাকে দেশের জন্য কিছু করার সুযোগ করে দিয়েছে। মূলত ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিই বাংলাদেশে প্রথম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসকে সাধারণ মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দেয়ার গুরু দায়িত্বটি কাঁধে তুলে নিয়েছিলো। তারা নিজ দায়িত্বে দেশে ও বিদেশে নেটওয়ার্কিং গড়ে তুলে মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে অমীমাংশিত কিছু দাবীকে আবারও জীবিত করে তুলেছিলো। শহীদজননীর মৃত্যুর পর এর পুরোপুরি দায়িত্বে আসেন আজকের সবার পরিচিত মুখ জনাব শাহরিয়ার কবির। আমরা এ প্রজন্মের অনেকে জানি না যে কেবলমাত্র যুদ্ধাপরাধী ইস্যুতে একগুঁয়ে ও নাছোড়বান্দা হবার কারণে এই শাহরিয়ার কবিরকে কী পরিমাণ হেয় করার চেষ্টা করেছে জামায়াতীরা। এখনও চলছে সেই প্রচেষ্টা। বিএনপি সরকারের দেয়া রাষ্ট্রদোহিতার মামলা মাথায় নিয়েই মৃত্যুবরণ করেছেন আমাদের সবার “আম্মা” শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে নির্মূল কমিটিকে আমি কেন শ্রদ্ধা করবো বা ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে কেন নির্মূল কমিটির ইতিহাসকে তুলে ধরা প্রয়োজন, তাহলে এক বাক্যে যা বলবো সেটি হচ্ছে সেদিনের, ১৯৯২ সালের নির্মূল কমিটির জন্ম না হলে হয়তো ২০১৩ সালের গণজাগরণ সৃষ্টি হতো না। নির্মূল কমিটির জন্ম না হলে আমাদের জীবদ্দশায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দেখে যেতে পারতাম না। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়া দল আওয়ামী লীগ হয়তো তাদের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলো কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের শিকড় এতোটাই শক্ত হয়ে গিয়েছিলো যে ক্ষমতার রাজনীতি করা দল আওয়ামী লীগও হয়তো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজটি এভাবে করতে পারতো না। এই একটা জায়গায় নির্মূল কমিটি তাদের প্রধান শক্তি হিসাবে কাজ করেছে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে আজকের প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে যতটা জানার সুযোগ পাচ্ছে অথবা সারা বিশ্বে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যতটা আলোচনা বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজ হচ্ছে তার সিংহভাগ কৃতিত্ব নির্মূল কমিটির।’

সর্ব ইউরোপীয় নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক যুক্তরাজ্যের মানবাধিকারকর্মী আনসার আহমদ উল্লাহ বলেন, ‘জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে আমাদের অভিজ্ঞতা বলে জঙ্গিবাদ সম্বন্ধে জনগণকে অবহিত করলে জনগণই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। তবে জনগণের পাশে যদি সরকার ও নাগরিক সমাজ থাকে তাহলে জনগণ আরও সাহস ও অনুপ্রেরণা পায়।’

নির্মূল কমিটির নিউইয়র্ক শাখার সাধারণ সম্পাদক মানবাধিকারকর্মী স্বীকৃতি বড়ুয়া বলেন, ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ গত ৩০ বছরে শুধু বাংলাদেশেই নয়, বহির্বিশ্বে গণমানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে একটি আইকনে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে এবং দেশের বাইরেও মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী নাগরিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে এখন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। এই আন্দোলন সম্পর্কে দেশে ও বিদেশে বেশ কয়েকটি প্রামাণ্যচিত্রও নির্মিত হয়েছে। ’৭১-এর গণহত্যাকারী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের দাবিতে নির্মূল কমিটির যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং শীর্ষ মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকরের মাধ্যমে আন্দোলনের সফলতা এসেছে। এখন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য নির্মূল কমিটি কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ একটি মৌলবাদমুক্ত, ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশে পরিণত হবে এই প্রত্যাশায় আমরা যারা এই আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত আছি, সেই লক্ষ্যেই আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।’

টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফোরাম ফর হিউম্যানিটি, তুরস্ক-এর সাধারণ সম্পাদক লেখক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা শাকিল রেজা ইফতি বলেন, ‘সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে সবার প্রথমে দরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রচার। দেশে ও বিদেশে সমানভাবে সরকার ও নাগরিক সমাজকে এই কাজটি করতে হবে। ‘তুর্কিয়ে বঙ্গবন্ধু’য়ু আনিওর’ (তুরস্কে বঙ্গবন্ধু) শিরোনামে আমি তুরস্কে বঙ্গবন্ধুর উপর একটি প্রামাণ্যচিত্র বানিয়েছি, তুর্কি ভাষায়। তুরস্কের বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষ মানবতার দর্শন সম্পর্কে কি ভাবছেন সেটিই জানার চেষ্টা করেছি এই প্রামাণ্যচিত্রে। এই কাজে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল ইস্তাম্বুল আমাদের সহযোগিতা করেছে। বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ সরকারের মিশনগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রচারে এবং বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে আরও উজ্জ্বল করে তোলার জন্য সচেষ্ট হতে হবে। প্রতিটি দেশের নাগরিক সমাজের কাছে বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরার জন্য আরও অভিনব পন্থা অবলম্বন করতে হবে। এই যেমন, একটি সড়কের নাম বঙ্গবন্ধু সড়ক করাটা যথেষ্ট না, সেই সড়কে যাতায়াতকারীদের এবং সেই এলাকার মানুষকে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সম্পর্কে জানাতে হবে। প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ এ ক্ষেত্রে একটি উপযোগী ও কার্যকর মাধ্যম। দেশব্যাপী সংস্কৃতি কর্মীদের একযোগে কাজ করতে হবে। সন্তানদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সংস্কৃতি চর্চায় উৎসাহী করে তোলার জন্য পরিবারকে সচেষ্ট হতে হবে।’

নির্মূল কমিটির বহুভাষিক সাময়িকী ‘জাগরণ’-এর হিন্দি বিভাগের সম্পাদক ভারতের সমাজকর্মী তাপস দাস বলেন, ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি অধ্যায়ের নাম ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। বঙ্গবন্ধুর পরবর্তী বাংলাদেশে যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, তার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী আন্দোলনের নাম নির্মূল কমিটি। যদি বাংলাদেশের আর্থিক উন্নয়নের পিছনে রাষ্ট্রীয় নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে, তাহলে বাংলাদেশে বৃহত্তর ধর্মনিরপেক্ষ সুশীল সমাজ গঠনে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি এক অনন্য নাম। আমরা আশা রাখবো মুক্তিযুদ্ধের সময় যে স্বপ্ন বাংলাদেশের মানুষ দেখেছিল, সেই সব স্বপ্নগুলোর মধ্যে এখনো পর্যন্ত যে স্বপ্নগুলো বাস্তবায়িত হয়নি সেগুলোকে বাস্তবায়িত করতে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।’
এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯ জানুয়ারি ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের দিনব্যাপী কর্মসূচি শুরু হয় সকাল সাড়ে ৮টায় মিরপুরে শহীদজননী জাহানারা ইমামের সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে।