রবিবার, ২ অক্টোবর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৭ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

লন্ডনে দুদিনব্যাপি ১০ম বাংলাদেশ বইমেলা-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উৎসব ২০২২ সফলভাবে সম্পন্ন,।




মকিস মনসুর,
৪ এবং ৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ যুক্তরাজ্যের লন্ডনে, সম্মিলিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ যুক্তরাজ্যের আয়োজনে সফলভাবে অনুষ্ঠিত হলো দুদিনব্যাপী ১০ম বাংলাদেশ বইমেলা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উৎসব। প্রবাসীদের প্রাণের এই উৎসবে যোগ দিতে যুক্তরাজ্য সহ বাংলাদেশ, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশ ও শহর থেকে কবি, সাহিত্যিক, সংস্কৃত কর্মী ইস্টলন্ডনের মাইল এন্ড পার্ক-এর, দ্যা আর্ট প্যাভিলিয়নে এসে উপস্থিত হন। কবি, সাহিত্যিক,সাংবাদিক শিল্পীও সংস্কৃতকর্মীসহ বইপ্রেমী নানা বয়সের মানুষের উপস্থিততে মেলা প্রাঙ্গন এক মিলন মেলায় পরিণত হয়।দুদিনব্যাপী মেলার প্রথম দিনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে না পেরে এক ভিডিয়ো বার্তায় নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্যসেন মেলার সাফল্য কামনা করে শুভেচ্ছা বার্তা প্রদান করেন।
উপস্থিত থাকতে না পেরে লিখিত শুভেচ্ছা বার্তায় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এমপি বলেন “প্রতিষ্ঠা পরবর্তী এ সংগঠনটি প্রতিবছরই লন্ডনে নিয়মিতভাবে বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজন করে থাকে। তাদের এ উদ্যোগ ও অনুষ্ঠানের সাথে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতা ও সম্পৃক্ততা রয়েছে। লন্ডন বইমেলায় প্রতিবছরই এ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলা একাডেমি ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র অংশগ্রহণ মেলাকে আরও সমৃদ্ধ করে”।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক জনাব কবি নূরল হুদা লিখিত শুভেচ্ছা বার্তায় বলেন “সম্মিলিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ যুক্তরাজ্য-এর উদ্যোগে লন্ডনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১০ম বাংলাদেশ বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব ২০২২। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ সংগঠনটি প্রতিবছরই নিয়মিতভাবে বইমেলা এবং সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজন করে আসছে। শুরু থেকে এ অনুষ্ঠানের সাথে বাংলা একাডেমির সম্পৃক্ততা রয়েছে। লন্ডন বইমেলায় প্রতি বছরই বাংলা একাডেমি বই বিক্রি ও প্রদর্শনীর স্টল দিয়ে থাকে। মেলায় বাংলা একাডেমির অংশগ্রহণ বাংলাদেশ থেকে অংশ নেয়া অন্যান্য নামকরা প্রকাশনী সংস্থাগুলোর জন্য ও উৎসাহের কারণ হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। লন্ডনের মতো দূর প্রবাসে এ ধরনের উদ্যোগ সব সময়ে অব্যাহত থাকবে বলে আমরা আশা রাখি।
১০ম বাংলাদেশ বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব ২০২২-এর সার্বিক সাফল্য কামনা করছি”।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক জনাব মিনার মনসুর লিখিত শুভেচ্ছা বার্তায় বলেন “যুক্তরাজ্য সম্মিলিত সাহিত ̈ ও সাংস্কৃতিক পরিষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১০ম বাংলাদেশ বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব ২০২২। প্রতিষ্ঠালগ্ন ২০০৯ থেকে এ সংগঠনটি এ ধরনের আয়োজনের সাথে যুক্ত। আর তখন থেকেই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এসব আয়োজনের পাশে থেকে উৎসাহ দিয়ে আসছে সবসময়”।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক গওহর রিজভী।বিশেষ অতিথি ছিলেন যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের মাননীয় হাইকমিশনার সাঈদা মুনা তাসনীম। মুক্তিযোদ্ধা,সংগঠক, যুক্তরাজ্য আওয়ামিলীগের সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরীফ, কথা সাহিত্যিক ড. শাহাদুজ্জামান, কবি কথা সাহিত্যিক ঘুংঘুর সম্পাদক ডা. হুমায়ুন কবির,ইত্তেফাকের সাবেক নির্বাহী সম্পাদক , বর্তমানে সম্পাদক সাপ্তাহিক রোববার, মুক্তিযোদ্ধা, লেখক সৈয়দ তোশারফ আলী, ডা. হাফিজ উদ্দিন সহ অনেক গুণীজন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি কবি ময়নূর রহমান বাবুল, অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে পরিচালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কবি এ কে এম আব্দুল্লাহ ও সদস্য বাচিক শিল্পী মুনিরা পারভীন।বিকেল সাড়ে তিনটায় শুরু হয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে বইমেলাটি।

অমর ২১শে গানের রচিয়তা আবদুল গাফফার চৌধুরীকে উৎসর্গ করা উৎসবে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। উদিচী ও সত্যেন সেন আর্ট এন্ড পারফরম্যান্স এর জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে উৎসবের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়। প্রথমবারের মতো সম্মিলিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ সাহিত্য পদক প্রদান করা হয় কবি নুরুজ্জামান মনিকে এবং বিলাতের লেখকদের লেখা নিয়ে সংগঠনের প্রথম প্রকাশনা তৃতীয় বাংলার মোড়ক উন্মোচন করা হয় অনুষ্ঠানের মুল মঞ্চে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে “বাংলা সাহিত্যে ও কবিতায় জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে তা পৃথিবীকে জানাতে হবে এবং সেই দায়িত্বটি প্রবাসীদেরই নিতে হবে, শুধুমাত্র বাংলা নয় প্রয়োজন এখন ভাষান্তরের” বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক জনাব গওহর রিজভী।
মাননীয় হাই কমিশনার সাঈদা মুনা তাসনিম আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, “নতুন প্রজন্মের ব্রিটিশ বাংলাদেশীদের এইসব আয়োজনে সংশ্লিষ্ট করতে হবে। বাংলাদেশ হাই কমিশন সব সময় আপনাদের পাশে থাকবে”।

মেলায় বাংলা একাডেমি সহ ১৫ টি বাংলাদেশি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, যুক্তরাজ্য ভিত্তিক দুটো এবং বাংলাদেশ হাইকমিশন এর পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু প্যাভিলন মেলায় অংশ নিয়েছে।
১০ম বাংলাদেশ বইমেলা উপলক্ষ্যে প্রকাশিত হয়েছে প্রায় ১০/১২টি প্রকাশনা। মেলায় প্রায় ১৩টির মতো প্রকাশিত বই ও লিটলম্যাগের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

উল্লেখ্য, দুপুর ১টা থেকে সাহিত্য- সংস্কৃতি প্রেমীরা মেলা প্রাঙ্গনে আসতে শুরু করেন। মেলার আয়োজন নিয়ে কমিউনিটির মাঝে ব্যাপক উৎসাহ দেখা দেয় এবং উপস্থিত সকলেই মেলায় অংশগ্রহণ করতে পেরে খুবই খুশি বলে অনুভুতি প্রকাশ করেন। অনেকেই লন্ডনে বসে পছন্দের বই কিনতে পেরে আনন্দিত।
দুদিনব্যাপী বইমেলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উৎসবে ছিল আলোচনা, মোড়ক উন্মোচন, উদিচি শিল্পীদের পরিবেশনা, নৃত্য,কবিতা আবৃত্তি, স্বরচিত কবিতাপাঠ, সংগীত। প্রথমবারের মতো অ্যাপাসেন লার্নার্স কালচারালাল গ্রুপের পরিবেশনা
(লার্নিং ডিসিবিলটি শিল্পীদের সংগীত পরিবেশনা) ছিল অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। এই পরিবেশনা মেলায় নিয়ে আসে এক নতুন মাত্রা।এধরনের অনুষ্ঠানের সুযোগ করে দেয়ায় সকলেই ভূয়াসী প্রসংশা করেন।

হল ভরতি মানুষের স্বতস্ফুর্ত উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত। মেলায় বই বিক্রি হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন প্রকাশকরা। বিভিন্ন দেশ এবং শহর থেকে আসা লেখক, পাঠক, শিক্ষানুরাগী, শুভান্যুধ্যায়ীর পদচারণায় মেলা প্রাঙ্গন একটুকরো বাংলাদেশে পরিণত হয়ে ওঠে।সমাপ্তি পূর্ব অংশগ্রহণকারী প্রকাশকদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তোলে দেয়া হয়। প্রকাশকদের পক্ষ থেকে সময় প্রকাশনীর কর্নধার জনাব ফরিদ আহমদ মেলা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন প্রবাসে এধরনের উৎসবমুখর বইমেলা দেখে আমি অভিভূত।

মেলায় কমিটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন পর্বে অংশ নেন- কাজল রশিদ, আবুল কালাম আজাদ ছোটন, নুরুল ইসলাম,ফারুক আহমেদ, ইকবাল হোসেন বুলবুল,স্মৃতি আজাদ, আনোয়ার শাহজাহান, আতাউর রহমান মিলাদ, আবু মকসুদ, মোস্তফা জামান চৌধুরী, হেনা বেগম, মোসাইদ খান, মুহাম্মদ মুহিদ,মোহাম্মদ ইকবাল,শামীম আহমদ, জুয়েল রাজ, ফারাহ নাজ,রহমত আলী, সৈয়দ হিলাল সাইফ, সাগর রহমান, সাঈম উদ্দিন খন্দকার, সাহাদাত করিম সহ অনেকে।

পরিশেষে দুদিনব্যাপী বইমেলা-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উৎসবকে সফল করতে অংশগ্রহণকারী সকলসহ যারা স্পন্সর, বিজ্ঞাপন, টিভি,(ইলেকট্রনিক),প্রিন্ট মিডিয়া ইত্যাদির মাধ্যমে এবং বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন সকলকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
আগামী বইমেলা- সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উৎসব অনুষ্ঠিত হবে ২০২৩খ্রিস্টাব্দে।